
‘পানি হু হু করে ঢুকেছে। ১০ মিনিটের মধ্যে বুকসমান পানি হয়ে যায় দোকানে। কিছুই বের করতে পারিনি। আমি পথে বসে গেলাম।’ কথাগুলো বলতে বলতে থেমে যান তানভির আহমেদ। চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক এলাকায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে তাঁর ‘আয়াত সার্জিক্যাল’ নামের ওষুধের দোকানটি এখন পানির নিচে। তাঁর ধারণা, ক্ষতির পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার বেশি।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে প্রথম দফায় পানি ঢুকে দোকান ডুবে যায়। আজ বুধবার বেলা তিনটার দিকে দ্বিতীয় দফায় পানি ঢুকতে শুরু করে। দুই দিনের ব্যবধানে একই আঘাত।
গতকাল মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ২০টি এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। এই জলাবদ্ধতায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। রাস্তাঘাট, অলিগলি ও দোকানপাট পানিতে ডুবে গিয়ে থমকে যায় নগরের স্বাভাবিক গতি।
আজ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আয়াত সার্জিক্যাল দোকানটির সামনে সড়কে এখনো থইথই করছে পানি। ভেতরের মেঝে সড়কের চেয়ে অন্তত ছয় ফুট নিচু হওয়ায় পানি জমে আছে। ভেতরে ঢোকার উপায় নেই। দরজা বন্ধ করে কর্মচারীরা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আয়াত সার্জিক্যালের কর্ণধার তানভির আহমেদ বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির কোনো পূর্বাভাস ছিল না। এর আগে কখনো এই পানি ঢোকেনি। তাই ভাবিনি এমন হবে।’
এবার বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। হঠাৎ করে পানি ঢুকতে শুরু করে দোকানটিতে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা ভয়াবহ রূপ নেয়। তানভির আহমেদ বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো হাঁটুপানি উঠবে। তাই কিছু মালামাল পাঁচ ফুট উঁচু তাকেও তুলে রাখছিলাম। কিন্তু পানি সেই উচ্চতাও পার হয়ে গেল।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় হলি হেলথ হাসপাতালের পাশের একটি ভবনের নিচতলায় দন্তচিকিৎসক উম্মে রিফাত হাসনাত নাবিলার ছোট্ট চেম্বারটি এখন অচল। গতকাল দুপুরে হঠাৎ ঢুকে পড়া পানিতে মুহূর্তেই ডুবে যায় পুরো চেম্বার। যেখানে প্রতিদিন রোগীদের ভিড় থাকত, সেখানে এখন থইথই পানি আর ভেসে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জাম।
দোকানটিতে ১০ জন কর্মচারী ছিলেন। কিন্তু পানির গতি ও চাপ এত বেশি ছিল যে কেউ কিছু সরানোর সুযোগ পাননি। তাঁদের চোখের সামনে সব ডুবে গেছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে দোকানের প্রায় সব পণ্য। তালিকাটা বেশ লম্বা। তানভির জানান, ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার, ইলেকট্রিক বেড, নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর, ব্লাড প্রেশার মেশিন, সার্জিক্যাল বেল্ট, অক্সিমিটার থেকে শুরু করে কম্পিউটার, সিসিটিভি ক্যামেরা, মনিটর, আইপিএস—সবই নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পানিতে ডুবে অকেজো হয়ে গেছে। কিছু সরঞ্জাম আজ সিটি করপোরেশনের গাড়িতে তুলে ফেলে দিতে হয়েছে।
তানভির বলেন, ‘কীভাবে আবার শুরু করব বুঝতে পারছি না। ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল সরানোর জায়গা নেই, নতুন করে পুঁজি জোগাড়েরও নিশ্চয়তা নেই। এখন ঋণ করে আবার দোকান চালু করতে হবে। কিন্তু সামনে বর্ষা। আবার যদি পানিতে সব তলিয়ে যায়, সে ভয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।’

তানভির আহমেদের দোকানের ঠিক পেছনেই নগরের হিজড়া খাল। বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় এই খালের সম্প্রসারণকাজ চলছে। তাঁর অভিযোগ, কাজের ধীরগতি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। সাত-আট মাস ধরে কাজ চলছে। বলা হয়েছিল এক মাসে শেষ হবে; কিন্তু এখনো শেষ হয়নি।
তানভির আহমেদ বলেন, ‘খালে অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। বৈশাখে বৃষ্টি হবে, এটা তো নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই হিসাব রাখা হয়নি। বাঁধগুলো আগে খুলে দিলে এত পানি জমত না। এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে এক থেকে দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা ডুবে যাচ্ছে।’
প্রবর্তক মোড় থেকে মেডিকেল কলেজের দিকে এগোলেই একই দৃশ্য। হিজড়া খালের পাশে সারি সারি দোকান। অনেকগুলোই এখনো পানির নিচে। আয়াত সার্জিক্যালের পাশেই ছোট একটি ফার্মেসি, ‘মা ড্রাগ হাউস’। দোকানের ভেতরে হাঁটুসমান পানি। ভেজা মেঝেতে টুলের ওপর বসে ছিলেন কর্মচারী বিংকি দাশ। তিনি বলেন, ‘গতকাল হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ে। নিচে রাখা সব ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
পানি ওঠার বর্ণনা দিতে গিয়ে বিংকি দাশ বলেন, ‘এত বছর কাজ করছি। কখনো দোকানে পানি ঢোকেনি। এবারই প্রথম।’

‘এমন অবস্থা আগে দেখিনি’
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় হলি হেলথ হাসপাতালের পাশের একটি ভবনের নিচতলায় দন্তচিকিৎসক উম্মে রিফাত হাসনাত নাবিলার ছোট্ট চেম্বারটি এখন অচল। গতকাল দুপুরে হঠাৎ ঢুকে পড়া পানিতে মুহূর্তেই ডুবে যায় পুরো চেম্বার। যেখানে প্রতিদিন রোগীদের ভিড় থাকত, সেখানে এখন থইথই পানি আর ভেসে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জাম।
চিকিৎসক নাবিলা বলেন, ‘এই চেম্বারে এখন আর রোগী দেখার কোনো সুযোগ নেই। সবকিছু পানির নিচে। কোনটা বাঁচবে, কোনটা নষ্ট হয়ে গেছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। এমন অবস্থা আগে দেখিনি। নতুনভাবে পেশাজীবন শুরু করেছি। অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে চেম্বারটি সাজিয়েছি। তবে আকস্মিক এই দুর্যোগে সেই স্বপ্ন এখন বড় ধাক্কা খেলো।’
পানির নিচে তলিয়ে গেছে চিকিৎসার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো। বৈদ্যুতিক সকেট ও সরবরাহ লাইন থেকে শুরু করে আইপিএস সিস্টেম—সবই পানির নিচে। রোগী বসার চেয়ার, টেবিলসহ আসবাবপত্র, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র—কিছুই রক্ষা পায়নি।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জামে। ডেন্টাল চেয়ার ইউনিট, হ্যান্ডপিস, মাইক্রোমোটর, স্কেলার মেশিন, এয়ার কম্প্রেসর, কিউরিং লাইট, অটোক্লেভ; একটির পর একটি যন্ত্র পানিতে ডুবেছে। নাবিলা বলেন, ‘এই যন্ত্রগুলো আমার কাজের মূল ভরসা। এগুলো ছাড়া চেম্বার চালানো সম্ভব নয়। এখন সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে। কিন্তু কীভাবে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’

আজও ডুবে আছে প্রবর্তক
আজ সকাল থেকে বৃষ্টির পর চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় আবারও জলাবদ্ধতার চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে প্রবর্তক মোড় ও কাতালগঞ্জ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বড় অংশজুড়ে জমে আছে ময়লা পানি। প্রবর্তক মোড়ে দুপুরের দিকে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের একাংশে হাঁটুপানি জমে আছে। কোথাও কোথাও তা বুকসমান। পানির রং কালচে, সঙ্গে নালা-নর্দমার বর্জ্য ভেসে বেড়াচ্ছে। সড়কের মাঝখান দিয়ে ধীরগতিতে চলাচল করছে রিকশা ও সিএনজি।
পথচারীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। কেউ জুতা হাতে নিয়ে প্যান্ট গুটিয়ে পানিতে নামছেন, কেউ আবার সড়ক বিভাজকের ওপর দিয়ে সাবধানে হেঁটে পার হচ্ছেন। ভিড়ের মধ্যে কয়েকজনকে মাঝপথে থেমে যেতে দেখা যায়। কোথা দিয়ে গেলে কম পানি, সেটি বুঝে পা বাড়াচ্ছিলেন তাঁরা। কাতালগঞ্জ এলাকায় চিত্র কিছুটা ভিন্ন হলেও ভোগান্তি কম নয়। সড়কের বিভিন্ন অংশে জমে থাকা পানি কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও গোড়ালি সমান। স্থানীয় নালাগুলো উপচে পানি উঠে এসেছে সড়কে। কিছু বিভিন্ন দোকানের সামনে পানি জমে থাকায় ক্রেতা কম। সড়কের পাশের ফুটপাতও অনেক জায়গায় ডুবে থাকায় মানুষকে সড়কেই নামতে হচ্ছে। এতে যানবাহন ও পথচারীর চলাচল একসঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খল অবস্থা।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় এখনো দুটি খালের কাজ চলমান রয়েছে। এসব খালে অস্থায়ী বাঁধ থাকায় কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ এখনো চলছে
জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম নগরে গত কয়েক বছরে বড় পরিসরে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ‘খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্প।
২০১৭ সালের আগস্টে অনুমোদন পাওয়া এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। সাড়ে আট বছর পেরিয়ে প্রকল্পটির অগ্রগতি এখন প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় থাকা ২১টি খালের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। দুটি ছাড়া অন্য খালগুলোর কাজও প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে হিজড়া খাল ও জামালখান খালের সম্প্রসারণ ও সংস্কারকাজ চলছে। এ জন্য খালে বেশ কিছু স্থানে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। গতকাল মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতে অন্তত ২০টি এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার পর বেশ কিছু বাঁধ সরিয়ে দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় এখনো দুটি খালের কাজ চলমান রয়েছে। এসব খালে অস্থায়ী বাঁধ থাকায় কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, গত বছর আগের তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কম এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। খালের কাজ শেষ হলে আগামী বর্ষায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কম এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : খোকন হাওলাদার, যোগাযোগ : আমির উদ্দিন সুপার মার্কেট (২য় তলা), নিশ্চিন্তপুর (দেওয়ান পাম্প সংলগ্ন), আশুলিয়া, ঢাকা- ১৩৪৯, বার্তা কক্ষ: ০৯৬৯৬৮২০৬৮১, ইমেইল : ajkerpratidin@gmail.com।
Ajker Pratidin গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান © 2018-2024 ajkerpratidin.com সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।