রিপোর্ট : মোঃ মেহেদী হাসান
সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বরিশালের গৌরনদীতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্মসূচির আওতায় উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর হাতে পর্যায়ক্রমে ১৫ হাজার ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু চারা বিতরণ নয়, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তার গাছের ‘অভিভাবক’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ে আজ উপজেলার ৩২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ হাজার ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব চারা সরবরাহ করা হয়।
এর আগে কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। তাঁর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে গৌরনদীতে ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ে জেলা প্রশাসক মোঃ মামুন খন্দকার গৌরনদী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে চারা বিতরণ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করা হয়।
তৃতীয় পর্যায়ে ৩২টি বিদ্যালয়ে ৫ হাজার চারা বিতরণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচিটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পরিচালিত এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃক্ষপ্রেম ও পরিবেশসচেতনতা তৈরি করা এবং ছোটবেলা থেকেই তাদের প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলা।
কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি চারার জন্য থাকবে একটি স্বতন্ত্র নম্বর। ওই নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় ও গাছের প্রজাতির তথ্য সংযুক্ত থাকবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে সংরক্ষণ করা হবে ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ’ রেজিস্টার। এতে শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি, রোল, গাছের নাম, বৈজ্ঞানিক নাম, রোপণের স্থান এবং গাছের বৃদ্ধি ও পরিচর্যার তথ্য লিপিবদ্ধ করা হবে।
চারা বিতরণের পরই শেষ হবে না কার্যক্রম। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তার বরাদ্দ করা গাছের ‘বৃক্ষ অভিভাবক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অভিভাবকের সহযোগিতায় উপযুক্ত স্থানে চারা রোপণ, নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার এবং গবাদিপশু ও অন্যান্য ক্ষতি থেকে গাছ রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সার ও অন্যান্য পরিচর্যার ব্যবস্থাও করতে হবে।
কর্মসূচির অন্যতম বিশেষ দিক হলো, শিক্ষার্থীদের শুধু গাছ লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজের গাছ সম্পর্কে জানতেও উৎসাহিত করা। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তার গাছের আঞ্চলিক ও প্রমিত বাংলা নাম, বৈজ্ঞানিক নাম, ফলজ বা ঔষধি গুণ এবং পরিচর্যার নিয়ম সম্পর্কে জানতে হবে। এর মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমকে ব্যবহারিক পরিবেশ শিক্ষার অংশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
চারা রোপণ ও পরিচর্যায় কারিগরি সহায়তা দেবে উপজেলা কৃষি অফিস। সংশ্লিষ্ট ব্লক সুপারভাইজারদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গর্ত প্রস্তুত, মাটি ও জৈবসারের ব্যবহার, পানি প্রয়োগ, আগাছা দমন, গাছের সুরক্ষা এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর বৃক্ষকে মাসিক ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১০ নম্বরে মূল্যায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। গাছের সুস্থতা, পরিচর্যা, বৃদ্ধি, গাছের পরিচয় ও বৈজ্ঞানিক নাম জানা, ফলজ বা ঔষধি গুণ সম্পর্কে জ্ঞান, গাছের সুরক্ষা এবং অন্যদের বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করার বিষয়গুলো মূল্যায়নে রাখা হবে। ১২ মাসে সর্বোচ্চ ১২০ নম্বরের ভিত্তিতে হবে বার্ষিক মূল্যায়ন।
বছর শেষে প্রতিটি বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীকে ‘বিদ্যালয়ের সেরা বৃক্ষপ্রেমী’ হিসেবে নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাকে সনদ, বিশেষ পুরস্কার এবং বৃক্ষচারা বা বাগান কিট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে উপজেলা পর্যায়েও ‘গৌরনদীর সেরা বৃক্ষপ্রেমী শিক্ষার্থী’ নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে।
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক জনাব মোঃ ইব্রাহিম এর সার্বিক সমন্বয়ে কর্মসূচিতে সহযোগিতা করছে উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা শিক্ষা অফিস, সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মসূচির প্রয়োজনীয় চারা সরবরাহ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিশুর হাতে একটি চারা তুলে দেওয়া মানে শুধু একটি বৃক্ষ রোপণ নয়; বরং তার হাতে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব তুলে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের যত্নে বেড়ে ওঠা এসব গাছ ভবিষ্যতে ফল, ছায়া ও অক্সিজেন দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
দীর্ঘমেয়াদে প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির আওতায় এনে এটিকে একটি চলমান উদ্যোগে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে ‘একজন শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ’ থেকে ‘একটি পরিবার, একটি বাগান’ এবং ‘একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সবুজ বনায়ন’—এই ধারায় কর্মসূচি সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে জহির উদ্দিন স্বপনের উদ্বোধন, দ্বিতীয় পর্যায়ে জেলা প্রশাসক মোঃ মামুন খন্দকারের অংশগ্রহণ এবং তৃতীয় পর্যায়ে ৩২টি বিদ্যালয়ে ৫ হাজার চারা বিতরণের মধ্য দিয়ে গৌরনদীতে কর্মসূচিটি ধাপে ধাপে বিস্তৃত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে বৃক্ষবান্ধব একটি নতুন প্রজন্ম। তাদের হাত ধরেই আরও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে গৌরনদী।
স্লোগান: ‘আজকের চারা, আগামী দিনের ছায়া
সম্পাদক ও প্রকাশক : খোকন হাওলাদার, যোগাযোগ : আমির উদ্দিন সুপার মার্কেট (২য় তলা), নিশ্চিন্তপুর (দেওয়ান পাম্প সংলগ্ন), আশুলিয়া, ঢাকা- ১৩৪৯, বার্তা কক্ষ: ০৯৬৯৬৮২০৬৮১, ইমেইল : ajkerpratidin@gmail.com।
Ajker Pratidin গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান © 2018-2024 ajkerpratidin.com সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।