
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত নতুন ১০-দলীয় রাজনৈতিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে গভীর সংকটে পড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে দলটির অন্তত নয়জন কেন্দ্রীয় নেতা দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন।
পদত্যাগকারীদের অভিযোগ, এনসিপি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আদর্শ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ার অঙ্গীকার থেকে সরে এসে প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পথে হাঁটছে। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতির কথাও তুলে ধরেছেন তারা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই মূলত এই অস্থিরতার সূচনা। এর আগে দলটির প্রায় ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে স্মারকলিপি দেন। তবে সেই আপত্তি উপেক্ষা করেই জোটে যোগদানের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় পদত্যাগের ঘটনা একের পর এক ঘটছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এনসিপির সঙ্গে জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণার পরপরই দলটির ভেতরে ভাঙন প্রকাশ্যে আসে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, নির্বাহী পরিষদের সঙ্গে আলোচনা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মতবিরোধ থাকতেই পারে, তবে সারাদেশের নেতা-কর্মী ও সহযোগী সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করছে। বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পাশে রাখার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
পদত্যাগকারী নেতাদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে রাজনৈতিক আপস, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্বচ্ছতা, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে সরে আসা এবং একটি নতুন, স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামো গড়ার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগ।
মীর আরশাদুল হক, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মনোনীত প্রার্থী, ২৫ ডিসেম্বর প্রথম পদত্যাগ করেন। তিনি মনে করেন, নতুন বন্দোবস্তের যে স্বপ্ন নিয়ে এনসিপির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে দল ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই সবচেয়ে জরুরি, অথচ এনসিপি সেই জায়গা থেকে সরে যাচ্ছে।
তাজনূভা জাবীন, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ও যুগ্ম আহ্বায়ক, ২৮ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। তিনি প্রকাশ্যে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার বিরোধিতা করে বলেন, নতুন রাজনীতির নামে পুরোনো ধারার সমঝোতা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তার অভিযোগ, ধাপে ধাপে অন্য সব রাজনৈতিক বিকল্প সরিয়ে রেখে দলকে পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট জোটের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
খালেদ সাইফুল্লাহ, দলের পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধান ও যুগ্ম আহ্বায়ক, ৩১ ডিসেম্বর রাতে সব দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এর আগেই তার স্ত্রী ও দলের মনোনীত প্রার্থী তাসনীম জারা ঘোষণা দেন যে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন না।
আরিফ সোহেল, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব, ৩০ ডিসেম্বর পদত্যাগ করে জানান—নতুন গণরাজনীতি গড়ার বদলে এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আপস করে সেই একই ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হলে দলীয় সীমার বাইরে দাঁড়ানোই এখন প্রয়োজন।
মুশফিক উস সালেহীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক ও যুগ্ম সদস্যসচিব, ১ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন। তার মতে, দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক অনুশীলনের অভাব, জোট রাজনীতির চরিত্র এবং এর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি এনসিপির ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে একটি মধ্যপন্থী ও আত্মনির্ভরশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করবে।
একই দিন খান মুহাম্মদ মুরসালীন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক, ভিডিও বার্তায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার অভিযোগ, নতুন বন্দোবস্তের কথা বললেও এনসিপি শেষ পর্যন্ত পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশীজনদের সঙ্গে সমঝোতায় গেছে, যা দলকে আদর্শিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে।
এর আগে ২৯ ডিসেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠক ও মাওলানা ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানী এনসিপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে নৈতিক সাহস, দায়বদ্ধতা ও ত্যাগ প্রয়োজন, এনসিপির ভেতরে তার ঘাটতি স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : খোকন হাওলাদার, যোগাযোগ : আমির উদ্দিন সুপার মার্কেট (২য় তলা), নিশ্চিন্তপুর (দেওয়ান পাম্প সংলগ্ন), আশুলিয়া, ঢাকা- ১৩৪৯, বার্তা কক্ষ: ০৯৬৯৬৮২০৬৮১, ইমেইল : ajkerpratidin@gmail.com।
Ajker Pratidin গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান © 2018-2024 ajkerpratidin.com সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।