

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি : ভোরের নীরবতাকে ঢাল বানিয়ে সাভারের আঞ্চলিক সড়কে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারিতে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাভারের বিরুলিয়া রোডের কালিয়াকৈর এলাকায় গাছ ফেলে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির ঘটনার সূত্র ধরেই পুলিশের নজরে আসে একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত ও মাদক সিন্ডিকেট।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র সাভার ও রাজধানীর বিভিন্ন সংযোগ সড়কে ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক কারবার চালিয়ে আসছিল। চক্রটির মূল হোতা হিসেবে শনাক্ত হন জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অঙ্গসংগঠন মৎস্যজীবী দলের নেতা মোঃ শাহ আলী ওরফে রাকিব (৩৮)।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) ভোর রাতে ডাকাতির প্রস্তুতির গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিরুলিয়া ইউনিয়নের কালিয়াকৈর এলাকার গোল্ডস্টার গার্মেন্টস সংলগ্ন বাঁশঝাড়ে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ১৫-১৬ জনের একটি ডাকাত দল পালানোর চেষ্টা করলে ধাওয়া করে ঘটনাস্থল থেকে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—সাভার পৌরসভার রাজাশন গ্যারেজ এলাকার তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মোঃ সানি মিয়া (৩৫), বিরুলিয়া ইউনিয়নের ছোট কালিয়াকৈর এলাকার আব্দুল মালেকের ছেলে মোঃ রাসেল মিয়া (৩২), একই এলাকার আবুল হাশেমের ছেলে মোঃ রিপন মিয়া (৩৩), হানিফ মিয়ার ছেলে মাসুদ রানা (৩১), সামাইর এলাকার চান মিয়ার ছেলে শাহিন মিয়া (৩১), তেঁতুলঝরা ইউনিয়নের পূর্বহাটি উত্তরপাড়া এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে সোহাবান মিয়া (২৩),
একই এলাকার আবু মিয়ার ছেলে নুর নবী (২৭)
এবং হেমায়েতপুরের উত্তর মেইটকা এলাকার হাছনের ছেলে ইমন মিয়া (২৫)।
গ্রেপ্তারকৃতদের দেহ তল্লাশিতে উদ্ধার করা হয় দুটি ধারালো লোহার দা, একটি লোহার ছুরি, একটি স্টিলের চাইনিজ কুড়াল ও তিনটি সুইচ গিয়ার চাকুসহ মোট সাতটি দেশীয় অস্ত্র। পরে ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করে, দীর্ঘদিন ধরে তারা পরস্পর যোগসাজশে ডাকাতি ও ছিনতাই চালিয়ে আসছিল এবং এই চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী ও নিয়ন্ত্রক ছিলেন মোঃ শাহ আলী ওরফে রাকিব।
পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান আরও জোরদার করে শুক্রবার দিবাগত (৩১ জানুয়ারি) রাত সাড়ে বারোটার দিকে সাভার পৌরসভার শাহীবাগ এলাকা থেকে শাহ আলী ওরফে রাকিবকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারের পর তিনি নিজেকে সাভার পৌর মৎস্যজীবী দলের সহ-সভাপতি দাবি করেন এবং বিএনপি মনোনীত ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। তার ফেসবুক প্রোফাইলে সংশ্লিষ্ট নেতার সঙ্গে একাধিক ছবি ও নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানায়, রাকিব মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর থানার ওয়াইল গ্রামের তোতা মিয়া ওরফে পাখি কবিরাজের ছেলে। তার চাচা আলোচিত বাচ্চু ডাকাত গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার পর রাকিব সাভারে এসে দীর্ঘদিন ধরে দিলখুশাবাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ও চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিল।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে দলীয় পরিচয় বদলালেও তার অপরাধী চরিত্র বদলায়নি। এর আগে তিনি নিষিদ্ধ ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রলীগের এক নেতার অনুসারী হিসেবেও অপরাধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী বলেন, “গাছ ফেলে আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনাকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেছি। ডাকাতির প্রস্তুতির খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে প্রথমে ৮ জন এবং পরে মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।”
এদিকে ডাকাত দলের সর্দার গ্রেপ্তারের পর সাভার পৌরসভা, বিরুলিয়া ও কালিয়াকৈর এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।