আর মাত্র কয়েক দিনের অপক্ষা। এরপরই দেশজুড়ে উদযাপিত হবে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ঈদকে সামনে রেখে সোমবার শেষ হয়েছে সরকারি ও আধা সরকারি অফিস-আদালতের কার্যদিবস।

মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে টানা সাতদিনের ছুটি। এরইমধ্যে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন নগরবাসী। তবে গাবতলী বাস টার্মিনালে চাহিদা অনুযায়ী যাত্রী পাচ্ছেন না পরিবহন শ্রমিকেরা। হাঁক-ডাক দিয়ে যাত্রী খুঁজতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। তবে অভিযোগ রয়েছে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার।
বাস কাউন্টার সংশ্লিষ্টরা জানান, অধিকাংশ যাত্রী ট্রেন ও পদ্মা সেতু ব্যবহার করছেন। ফলে ঢাকা থেকে বের হওয়ার একাধিক রুট ও মাধ্যম ব্যবহারের কারণে গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা দিয়েছে যাত্রী সংকট।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
দেখা গেছে, গাবতলী বাস টার্মিনালে নেই যাত্রীদের ভিড়। অনেকটাই ফাঁকা বাস কাউন্টারগুলো। কোনো কোনো কাউন্টারের সামনে গাড়ির অপেক্ষায় বসে সময় কাটাচ্ছেন দূরপাল্লার যাত্রীরা। কেউ কেউ আবার কাউন্টারগুলোতে গন্তব্যের টিকিট খুঁজতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

এদিকে কাউন্টারে দায়িত্বরত পরিবহন শ্রমিকেরা হাঁক-ডাক দিয়ে যাত্রী খুঁজছেন। এছাড়াও সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের গাবতলী বাস টার্মিনাল কেন্দ্রিক সড়ক যানজটমুক্ত করতে কাজ করছেন। একইসঙ্গে টার্মিনালে র্যাব ও পুলিশ কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নজরদারি করতে দেখা গেছে।
সূর্যমূখী পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার সারওয়ার বলেন, আপনি দেখেন এখানে বেশিরভাগ বাস কাউন্টার এখন ফাঁকা পড়ে আছে, যাত্রী নেই। পদ্মা সেতু হওয়ার পরে আমার এখানে যাত্রীর সংখ্যা একেবারে কমে গেছে। আমাদের পরিবহন শ্রমিকরা ডেকেও যাত্রী পাচ্ছেন না।
যাত্রী সংকটের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন সাইড দিয়ে মানুষ যাতায়াত করছে। ট্রেনে যাচ্ছে বেশি মানুষ। তাছাড়া পদ্মা সেতু হওয়ার পর এই রুটে যাত্রী সবচেয়ে কম।
দ্রুতি পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার সাঈদ বলেন, যাত্রীর খুব খারাপ অবস্থা। গাড়ি ছাড়তে পারছি না। অধিকাংশ গাড়িতেই ছিট ফাঁকা। ব্যবসা নেই এবার। অধিকাংশ মানুষ পদ্মাসেতু দিয়ে যাতায়াত করে। ঢাকার যানজটের কারণে গাবতলী কাউন্টারে আসতেই ২/৩ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। তার থেকে ভালো মানুষ এখন যাত্রাবাড়ী থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে যাতায়াত করে।

টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ কাউন্টার বন্ধ রয়েছে। ঘরে ফেরা মানুষের একেবারেই এখানে চাপ নেই বললেই চলে।
রাবেয়া পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার কাইয়ুম বলেন, যাত্রী নেই। আবার গাড়িও নেই। সকাল থেকে মাত্র ৫টা গাড়ি ছেড়ে গেছে। সকালে কিছু যাত্রী ছিল। কাউন্টার এখন ফাঁকা। স্টাফরা ঝিমাচ্ছে।
তিনি বলেন, কি করবো বলেন, দুই একজন যাত্রী আসছে কিন্তু টিকিট দিতে পারছি না। গাড়িগুলো পাম্পে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। যাত্রী এলেও গাড়ি কখন তেল নিয়ে আসবে জানি না। তাই যাত্রীদের টিকিট দিতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, সরকার বলছে তেলের অভাব নেই। অথচ পাম্পে গিয়ে তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একজন গাড়ির হেল্পার একটা ট্রিপ নিয়ে এসে আবার ব্যাক যায়। সারা দিনে বেতন পায় ৪০০ টাকা। ট্রিপই যদি না পায় তাহলে তারা কীভাবে চলবে।
বরিশালের যাত্রী রাকিব বলেন, কাউন্টারে এসেই টিকিট পেয়েছি। টিকিট পেতে কোনো ঝামেলা হয়নি। এখন দেখার বিষয় বাস সময়মতো ছাড়ে কিনা।
দিনাজপুরের যাত্রী আসাদুল বলেন, কাউন্টারে এসেছি একটু আগে। এখন টিকিট কাটিনি। কয়েকটা কাউন্টারে খোঁজ নিলাম বললো টিকিট আছে। আমার সঙ্গে আরেকজন আছে। সে আসছে এলে টিকিট কাটবো।
তিনি বলেন, আগে ঈদের সময় দুই-তিনদিন আগে কাউন্টারে এসেও টিকিট পেতাম না। আর এখন কাউন্টারে এলেই টিকিট পাওয়া যায়। আগের মতো টিকিট পেতে সেই ভোগান্তিটা নেই। তবে ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
সাতক্ষীরার তালা এলাকায় যাবেন জাকির হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, আমরা সবসময় ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে যাই। কিন্তু এখন সুন্দরবন এক্সপ্রেস বাস আমার কাছ থেকে ৫০০ টাকার ভাড়া এক হাজার টাকা নিয়ে নিল। আমাদের তো উপায় নেই বাড়ি তো যেতে হবে।

নাটোরের যাত্রী মো. ইমরান বলেন, আজ বাড়ি যাবো। কাউন্টারে এসে টিকিট পাবো কিনা এই জন্য গতকাল সন্ধ্যায় এসে টিকিট কেটেছি। কিন্তু আজ এসে দেখছি কাউন্টার থেকে ডেকে ডেকে টিকিট বিক্রি করছে। যাত্রীর চাপ অনেক কম।
বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টার শ্রমিকরা বলছেন, আমাদের বিআরটিএ থেকে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। সারা বছরই এই নিয়মে চলার কথা। কিন্তু আমরা যাত্রীদের থেকে ভাড়া তখন কম নেই। কিন্তু অনেকেই মনে করেন আমরা ভাড়া বেশি নিচ্ছি, বিষয়টা এমন নয়। ঈদের সময় আমাদের বাস যাত্রী ফুল করে নিয়ে যাবে, আসার সময় পুরাটাই খালি আসবে। আগে যাওয়া এবং আসায় বাস ভাড়া গুলো সমন্বয় করা হতো। আগামীকাল একটা চাপের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিআরটিএ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুকান্ত সাহা বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে যাত্রী সাধারণের নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচলের লক্ষ্যে বিআরটিএ, পুলিশ বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ে আমাদের এখানে ডিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। যাত্রীদের হয়রানি অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ায় অভিযোগ পেলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি, জরিমানা করছি। অনেককেই সতর্ক করা হচ্ছে।
যাত্রীদের হয়রানি বন্ধে এবং তাদের যাত্রা সহজ করতে মিরপুর বিভাগ থেকে একটি কন্ট্রোল রুম, ট্রাফিক মিরপুর বিভাগের কন্ট্রোল রুম, র্যাব-৪ এর পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুম এবং বিআরটিএ-সহ গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে ভিজিলেন্স টিম রয়েছে।











