
রিপোর্ট : মোঃ মাসুদ সরদার
সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, মধ্যস্থতাকারীর দৌরাত্ম্য কিংবা দিনের পর দিন ঘোরাঘুরির অভিযোগ নতুন নয়। তবে বরিশালের গৌরনদীতে সরকারি সেবাকে মানুষের কাছে সহজ করতেও গৌরনদী করতে উপজেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহিম এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) (এসিল্যান্ড) মো. মেহেদী হাসানের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের অনেকেই ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে সরাসরি গিয়ে সমস্যা তুলে ধরার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে সরকারি সেবা নিতে মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা কমছে বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাজ শুধু অফিসে বসে ফাইল নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠপর্যায়ে মানুষের সমস্যা দেখা, অভিযোগ শোনা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়েই প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। গৌরনদীতে ইউএনও মো. ইব্রাহিমের মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রম এ কারণে নজরে এসেছে।
গৌরনদীতে মাদকবিরোধী অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতা রয়েছে। প্রশাসনের উদ্যোগ ও স্থানীয় পর্যায়ের সচেতনতা কার্যক্রমের প্রভাবে খানজাপুর এলাকায় কয়েকজন মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইউএনওর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন বলে জানা গেছে।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি মাদকসেবী ও মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পরিবার, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, সামাজিক সংগঠন ও তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, অভিযানের পাশাপাশি কাউকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া গেলে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের সামাজিক প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বর্ষা ও ডেঙ্গুর মৌসুমে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও মাঠে দেখা গেছে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। ইউএনও মো. ইব্রাহিম ও এসিল্যান্ড মো. মেহেদী হাসান বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তদারকি এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
এ সময় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং দীর্ঘদিন জমে থাকা পানি অপসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সরকারি কর্মকর্তারা যখন শুধু নির্দেশনা না দিয়ে নিজেরাও মাঠে উপস্থিত হন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও কাজটির গুরুত্ব বাড়ে। প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হওয়ায় সচেতনতা কার্যক্রমও বেশি কার্যকর হতে পারে।
উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা নিজেদের সমস্যা সরাসরি কর্মকর্তাদের কাছে তুলে ধরতে পারছেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য ঠিক থাকলে বিধি অনুযায়ী সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সেবাগ্রহীতাদের কয়েকজনের ভাষ্য, আগে সরকারি অফিসে কোনো কাজ করতে গেলে কোথায় যেতে হবে, কী কাগজ লাগবে কিংবা কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—এসব নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়তেন। এই সুযোগে মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভরশীলতাও তৈরি হতো।
তাদের মতে, একজন সেবাগ্রহীতা যদি সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে গিয়ে নিজের সমস্যাটি বলতে পারেন, তাহলে ভুল তথ্যের সুযোগ কমে এবং সময় ও অর্থের অপচয়ও কমানো সম্ভব।
গৌরনদী উপজেলা ভূমি অফিসে ভূমি-সংক্রান্ত সেবা সহজ করতে কাজ করছেন এসিল্যান্ড মো. মেহেদী হাসান। নামজারি, ভূমি-সংক্রান্ত আবেদন, শুনানি এবং বিভিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সেবাগ্রহীতাদের ভাষ্য, ভূমি অফিসের সেবায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা। কাগজপত্র সঠিক থাকলে নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত শুনানি ও কার্যক্রম সম্পন্ন হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমে।
ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে সরাসরি শুনানি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য শোনার সুযোগ থাকায় অনেক সেবাগ্রহীতা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
ভূমি অফিসে সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া, নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করা এবং সরকারি ফি পরিশোধের মাধ্যমে সেবা নেওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা হলো সঠিক তথ্যের অভাব। আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সরকারি ফি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যায়।
তাদের মতে, স্বচ্ছ তথ্য, সরাসরি শুনানি এবং নিয়মিত তদারকি—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে ভূমি অফিসের সেবায় মানুষের আস্থা আরও বাড়তে পারে।
জনসেবার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রেও উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক, খাদ্যে ভেজাল, অবৈধ কার্যক্রম, সড়কে অনিয়মসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের এমন তৎপরতায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সচেতন মহলের মতে, একটি উপজেলার উন্নয়ন শুধু সড়ক, ভবন কিংবা অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষ কতটা সহজে সরকারি সেবা পাচ্ছেন, অভিযোগ জানালে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং সরকারি দপ্তরে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না—এসব বিষয়ও প্রশাসনের কার্যকারিতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের উপস্থিতি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সরকারি সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউএনও ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহিম এবং এসিল্যান্ড মো. মেহেদী হাসানের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের একটি অংশ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে তাদের প্রত্যাশা, ব্যক্তি বা কর্মকর্তা পরিবর্তনের সঙ্গে যেন জনবান্ধব সেবার ধারাবাহিকতা থেমে না যায়।
সেবাগ্রহীতাদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা যখন সাধারণ মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, মাঠে গিয়ে সমস্যা দেখেন এবং বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন, তখন প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়।
একইভাবে ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা, নিয়মিত শুনানি এবং দ্রুত আইনানুগ সেবা নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
গৌরনদীর মানুষের প্রত্যাশা, সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো নাগরিক যেন দালাল, মধ্যস্থতাকারী কিংবা অযথা হয়রানির ওপর নির্ভরশীল না হন। বর্তমান উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব আরও কমবে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।
আর সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই স্থানীয়দের কেউ কেউ ইউএনও মো. ইব্রাহিম ও এসিল্যান্ড মো. মেহেদী হাসানের জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডকে গৌরনদীর মানুষের জন্য ‘আস্থার জায়গা’ ও ‘আশার বাতিঘর’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।