
সম্রাট আলাউদ্দিন, ধামরাই (ঢাকা) : ২০২৩ সালের ১০ জুন।ঢাকার ধামরাইয়ের কুশুরা ইউনিয়নে জমকালো আয়োজনে বৈন্যা-কুশুরা পুলিশ ক্যাম্পটি উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নিজে উপস্থিত থেকে এ ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন। ১৩ পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সেখানে পদায়ন করা হয়। এরপর থেকে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অস্থায়ী ক্যাম্পটিতে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা কাজ করতে থাকেন। দিন-রাত সব সময় সেখানে সাধারণ মানুষের পদচারণা থাকত।কিন্তু ওই ক্যাম্পটিতে এখন সুনসান নীরবতা।

দরজাও তালাবদ্ধ, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরা চলে যান। এরপর আর তারা সেখানে ফেরেননি। অন্যদিকে পুলিশ না থাকায় ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বেড়েছে চুরিসহ একাধিক অপরাধের ঘটনা।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই এলাকার বৈন্যা গ্রামে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাবেক সভাপতি বেনজীর আহমদের আপন বড় ভাই সোহরাব হোসেনের বাড়ি রয়েছে। তার বাড়িতে একবার ডাকাতি হয়েছিল। ওই ঘটনার পরই সেখানে পুলিশ ক্যাম্পটি চালু করা হয়।
স্থানীয়দের নিরাপত্তার কথা বলা হলেও মূলত এমপির ভাইয়ের বাড়ির নিরাপত্তার উদ্দেশেই ক্যাম্পটি চালু করা হয়েছিল। যদিও কিছুদিন পরই স্থানীয়রাও ক্যাম্পটির সুফল ভোগ করতে থাকেন। এলাকায় চুরি-ডাকাতির মতো ঘটনা বন্ধ হয়ে যায়।জানা গেছে, পুলিশ ক্যাম্পটি স্থাপন করা হলেও সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জায়গা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তখন ওই গ্রামে থাকা নবজাগরণী সংঘ নামে একটি সংগঠনের ক্লাব ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরে সেখানে আরও একটি টিনশেড ঘর তৈরি করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ক্যাম্পটির ভেতরে এখন ময়লা জমেছে। গেটের সামনে রোপণ করা গাছগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে মারা গেছে। পতাকা উত্তোলনের জন্য রাখা খুঁটিগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। স্থানীয়রা ক্যাম্পের চত্বরে কাঠের লাকড়ি রোদে শুকাতে দিয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশ সদস্যরা যেখানে থাকতেন, সেখানে ক্লাবের সদস্যরা ফিরে এসেছেন। স্থানীয় বিভিন্ন বয়সের তরুণরা সেখানে আড্ডা দিচ্ছেন।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ না থাকার সুযোগে ওই এলাকায় চুরির ঘটনা বেড়েছে। বাসাবাড়ির হাঁড়ি-পাতিল, নলকূপের মাথা, মুদি দোকানের মালামাল কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না। চুরি ভয়ে অনেকেই রাতে ঘুমাতে পারছেন না। একই সঙ্গে বেড়েছে মাদকসেবীদের উপদ্রপ।
পুলিশ ক্যাম্পটির পাশেই দোকান আছে পলাশ রায় নামে এক ব্যবসায়ীর। ক্যাম্প থাকার সময় এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ছিল জানিয়ে এই মুদি দোকানি বলেন, তখন মাদকসেবীরা ছিল না। চুরিও হতো না। কিন্তু ১৫ দিন আগে চোররা আমার দোকানের টিন কেটে অনেক টাকার মালামাল নিয়ে যায়। পুলিশ থাকলে হয়তো এমনটা হতো না। মাদকসেবীদের আড্ডা বন্ধ থাকত,এখন তো আতঙ্কে থাকতে হয়। স্থানীয়দের স্বার্থে, সবার সুবিধার জন্য পুলিশ ক্যাম্পটি চালু করা প্রয়োজন।কেন পুলিশ সদস্যরা ক্যাম্প থেকে চলে গেলেন জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ী বলেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকারের পতনের পর আর পুলিশ কাজে ফেরেনি। শুধু এক দিন এসেছিল,তাও তাদের মালামাল নিয়ে যেতে।ওই গ্রামের বাসিন্দা লুৎফর রহমান বলেন, আমার বাড়িতে মাস খানেক আগে চুরি হয়েছে।
নলকূপের মাথা নিয়ে গেছে। পুলিশ থাকলে অন্তত তাদের ভয়ে হলেও এমন কাজ কেউ করতে পারত না। অন্তরা দাস নামে একজন ভ্রাম্যমাণ দোকানি বলেন, স্বামী-স্ত্রী মিলে গত সাত দিন ধরে এখানে দোকান করছি। কিন্তু পুলিশের দেখা কখনো পাইনি।পুলিশ ক্যাম্পটির পেছনেই বাড়ি শফিকুল ইসলামের। এক বছর আগে যখন ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল তখন তিনি সেখানে ছিলেন। বলেন,পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে এলাকার সবারই ভালো সম্পর্ক ছিল। বিপদে তাদের পাওয়া যেত। তখন ভালো ছিলাম। এখন মাঠে পুলিশ থাকলে দুষ্টু লোকের আধিপত্য থাকত না।কুশুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান একটি হত্যা মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। তার অবর্তমানে কথা হয় ইউপি সদস্য মো. সোলাইমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সাবেক এমপি বেনজীর আহমদ তার পারিবারিক নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ক্যাম্পটি স্থাপন করলেও এর সুফল কিন্তু এলাকাবাসীও ভোগ করত। তখন চুরি-ডাকাতি,মাদকসেবীদের উপদ্রপ কমে গিয়েছিল।
এলাকাবাসীর মঙ্গলের স্বার্থে পুলিশ ক্যাম্পটি পুনরায় চালু করা উচিত।কবে নাগাদ চালু হবে বৈন্যা-কুশুরা পুলিশ ক্যাম্প? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয় ধামরাই থানার ওসি মনিরুল ইসলামের সঙ্গে। তার কাছে উত্তর না মিললেও পাওয়া যায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ।
অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঢাকা জেলা) জসিম উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বিষয়টি প্রতিবেদকের মাধ্যমেই জানতে পারলেন! বিষয়টি নিয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করার আশ্বাস দেন।