
শিশু জিহাদের এই প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের অসহায়ত্বের গল্প নয়; এটি দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা অসংখ্য শিশুর বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। যে হাতে থাকার কথা বই-খাতা ও কলম, সেই হাতে জীবিকার প্রয়োজনে তুলে নিতে হয়েছে তরকারি বিক্রির দায়িত্ব। পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার তাগিদে ছোট্ট জিহাদকে প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার তারাকুপি গ্রামের বাসিন্দা জিহাদ। তার বাবা জসিম চাপরাশি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ায় পাঁচ সদস্যের পরিবারটি এখন চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। একদিকে বাবার ব্যয়বহুল চিকিৎসা, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর চাপ—সব মিলিয়ে পরিবারটির সামনে দেখা দিয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
সংসারের তাগিদে বাসস্ট্যান্ডে তরকারি বিক্রি
রবিবার (১১ অক্টোবর) গৌরনদীর কটকস্থল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, পরিবারের প্রয়োজনে তরকারি বিক্রি করছে শিশু জিহাদ। যে বয়সে তার বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বসে শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ নেওয়ার কথা, সেই বয়সে তাকে সময় দিতে হচ্ছে জীবিকা অর্জনের চেষ্টায়।
শিশুটির স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা ও খেলাধুলার সুযোগ। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট তার শৈশবকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সংসারের অসচ্ছলতা ও বাবার অসুস্থতার কারণে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
জিহাদের জীবনসংগ্রামের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, তার কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ক্ষুধা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে একটি শিশুর কাছে পড়াশোনার স্বপ্নও যেন কঠিন হয়ে উঠছে। অথচ এই বয়সে তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল পরিবারের স্নেহ, বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং নিশ্চিন্ত শৈশব।
ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবা, থমকে গেছে সংসারের আয়
জিহাদের বাবা জসিম চাপরাশি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলত পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরণপোষণ। কিন্তু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকায় পরিবারের নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। চিকিৎসার ব্যয়, হাসপাতালে যাতায়াত এবং পরিবারের অন্যান্য খরচ একসঙ্গে বহন করা আর্থিকভাবে অসচ্ছল একটি পরিবারের জন্য বড় ধরনের চাপ। জসিম চাপরাশির পরিবারও সেই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বাবার অসুস্থতা শুধু একজন উপার্জনক্ষম মানুষের কর্মক্ষমতা কেড়ে নেয়নি; এর প্রভাব পড়েছে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনে। সংসারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবার, চিকিৎসা ও শিশুদের শিক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিশু জিহাদের ওপরও এসে পড়েছে সংসারের সংকটের চাপ।
‘ভাত খাইতে পারি না, ইস্কুলে যামু কেমনে?’
জিহাদের মুখে উচ্চারিত এই কথাগুলো দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। একটি শিশুর কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়ার স্বপ্ন যতটা স্বাভাবিক, ক্ষুধার্ত পেটে সেই স্বপ্ন পূরণ করা ততটাই কঠিন। খাবারের নিশ্চয়তা যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
শিশুশ্রম ও দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশুর শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া শুধু তার ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি ভবিষ্যৎ সমাজের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। শিক্ষা একটি শিশুকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ দেখায়, দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সেই সুযোগ বাধাগ্রস্ত হলে শিশুটির ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
জিহাদের ক্ষেত্রেও তাই প্রয়োজন এমন সহায়তা, যাতে তার পরিবারের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তাকে পড়াশোনায় ধরে রাখা যায়। শুধু সাময়িক আর্থিক সহযোগিতা নয়, তার শিক্ষা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান
ক্যান্সারে আক্রান্ত জসিম চাপরাশির চিকিৎসা এবং তাঁর পরিবারের সংকট মোকাবিলায় সমাজের বিত্তবান, দানশীল ব্যক্তি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও মানবিক সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। সম্মিলিত উদ্যোগে তাঁর চিকিৎসার ব্যয় বহন, পরিবারের খাদ্যসহায়তা এবং শিশু জিহাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হতে পারে।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সমাজসেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবারটি কোনো ধরনের চিকিৎসা সহায়তা, আর্থিক অনুদান কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগও জিহাদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু তাদের বর্তমান সংকট কিছুটা লাঘব করা নয়; একই সঙ্গে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষার সুযোগ তৈরি করা। জিহাদের হাতে আবার বই-খাতা তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে তার শৈশবকে জীবিকার কঠিন বাস্তবতা থেকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষার পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
আজ জিহাদের কণ্ঠে ভেসে আসা প্রশ্ন—‘ভাত খাইতে পারি না, ইস্কুলে যামু কেমনে?’—সমাজের বিবেকের কাছে এক গভীর আবেদন। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা এবং শিশুটির শিক্ষার অধিকার রক্ষায় প্রয়োজন মানবিক উদ্যোগ ও সম্মিলিত সহযোগিতা।
মানবিক সহায়তাই পারে জিহাদের পরিবারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে, আর তার ছোট্ট হাতে তরকারির বদলে আবার বই-খাতা তুলে দেওয়ার পথ তৈরি করতে।