
জসহিদুল ইসলাম, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধিঃ
বাঙালির কাছে মে মাস মানেই মধুমাস, কিন্তু খুলনার কয়রা তথা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে এ এক বিভীষিকার নাম। ‘আইলা’, ‘আম্ফান’ কিংবা ‘রেমাল’—বিগত বছরগুলোর তিক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ক্যালেন্ডারের পাতা মে মাসে পৌঁছালেই মেঘের গর্জনে কেঁপে ওঠে উপকূলের প্রতিটি ঘর। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর ভিটেমাটি হারানো নদীভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে শুরু করেছে হাজারো পরিবার।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে এবং প্রকৃতির সাথে লড়াইয়ে টিকে থাকার আগাম রণকৌশল ঠিক করতে বুধবার (১৩ মে) সকালে কয়রা উপজেলা প্রশাসন এক বিশেষ প্রস্তুতি সভার আয়োজন করে। উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় উঠে আসে উপকূলবাসীর আর্তনাদ ও প্রশাসনের সতর্ক অবস্থানের চিত্র।
জাপানি উন্নয়ন সংস্থা ‘শাপলা নীড়’-এর অর্থায়নে ও বেসরকারি সংস্থা ‘জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস)’-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এই সভায় বক্তারা উপকূলীয় জীবনের রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেন। তারা বলেন, মে-জুন মাস এলেই কয়রাবাসীর চোখে ঘুম থাকে না। বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঘরে ঢোকার ভয় যেন ছায়ার মতো তাড়া করে বেড়ায়। জীবন বাঁচানোর এই যুদ্ধে এবারও ‘সমন্বিত আগাম প্রস্তুতি’কে মূল অস্ত্র হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বলেন: “দুর্যোগ আসবেই, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শূন্য ক্ষয়ক্ষতি। মাঠ পর্যায়ের সাইক্লোন শেল্টারগুলো ২৪ ঘণ্টা ব্যবহার উপযোগী রাখতে হবে এবং সতর্কবার্তা পৌঁছাতে হবে প্রতিটি দুয়ারে। দুর্যোগের সময় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।”
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল জাবিরের সঞ্চালনায় সভায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা নদীভাঙন রোধে এবং জানমাল রক্ষায় যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসার সমীর কুমার সরকার, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আবুল কালাম আজাদ, এবং প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তপন কুমার কর্মকার। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক ইমতিয়াজ উদ্দিন, কয়রা বাজার কমিটির সভাপতি সরদার জুলফিকার আলম এবং ফায়ার সার্ভিসের টিম লিডার মোঃ আহাদ আলীসহ স্থানীয় সিপিপি ও নারী নেত্রীবৃন্দ।
জেজেএস-এর প্রস্তুতি প্রকল্পের ম্যানেজার শ্রী অশোক কুমার রায় দুর্যোগকালীন ঝুঁকি হ্রাসের বিভিন্ন কারিগরি দিক তুলে ধরেন।
কয়রাবাসী জানেন, প্রকৃতি তাদের প্রতি সবসময় সদয় নয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, টেকসই বাঁধ এবং সময়ের সঠিক বার্তা বদলে দিতে পারে কয়েক হাজার পরিবারের ভাগ্য। দুর্যোগের এই মৌসুমে প্রশাসন আর সাধারণ মানুষের সম্মিলিত চেষ্টাই এখন কয়রার একমাত্র রক্ষাকবচ।