
চট্টগ্রাম : জঙ্গল ছলিমপুরে যারা বসতি করেছে তাদের কাউকে ‘আপাতত’ উচ্ছেদ করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
যৌথবাহিনীর নির্মাণাধীন ক্যাম্পে সন্ত্রাসী হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার এক সপ্তাহের মাথায় রোববার চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য’ খ্যাত জঙ্গল ছলিমপুর গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিগত ১৭ বছরের দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি অথবা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন—যাই বলি, তার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের মধ্যে দুর্বৃত্তের রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। সেটার একটা নমুনা হচ্ছে এই জঙ্গল সলিমপুর।”
জঙ্গল ছলিমপুরে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, সেনাবাহিনীর কী কী সুযোগ সুবিধা করা যায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “স্থানীয় অধিবাসী, যারা বিভিন্নভাবে এখানে কোনো না কোনো কারণে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছে অস্থায়ীভাবে, বা রিহ্যাবিলিটেটেড হয়েছে বিভিন্ন কারণে; তাদেরকে কীভাবে পুনর্বাসন করা যায়, সেটা আমরা একটা পরিকল্পনা করব। তাদের কাউকেই এখান থেকে আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না।”
সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদার দাবিতে বিভিন্ন স্থানে হামলা, ব্যবসায়ীদের ঘরে গুলির ঘটনাগুলো নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাসের মধ্যে চট্টগ্রামে কিছু সন্ত্রাসী কার্যক্রম লক্ষ্য করেছিলাম। কিছু ব্যবসায়ীর বাসভবনে গিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গুলিগালাজ করার পরে, তাদেরকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার পরে, চাঁদা আদায়ের জন্য—আমরা বিষয়টা খুব গুরুত্ব সহকারে নিই। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তাদের অভয়ারণ্য আগে নষ্ট করতে হবে।”

এর অংশ হিসেবেই গত ৯ মার্চ জঙ্গল ছলিমপুরে যৌথবাহিনী বড় পরিসরে অভিযান চালিয়েছিল-এমন ইংগিত দিয়ে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমরা সেটা করতে পারিনি। কারণ, কোনো না কোনো কারণে হয়ত এই তথ্যগুলো ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে তারা আগে থেকে সাবধান হয়ে গিয়েছিল বলে আমার মনে হয়।
“যাই হোক, এখানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে, বিভিন্ন পাহারাদার বসিয়ে যেভাবে এলাকাগুলো তারা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল সেগুলো ভেঙে দেয়া হয়েছে।”
গত ২৪ মে গভীর রাতে যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের হামলা-ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা অবাক হয়ে গেলাম, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করার মত দুঃসাহস সন্ত্রাসীদের কীভাবে হল! তারা এই রাস্তা কেটে, ভেকু নিয়ে এসে, বুলডোজার নিয়ে এসে র্যাবের আন্ডার কনস্ট্রাকশন ক্যাম্প ভেঙে দেওয়ার সাহসটা কোত্থেকে পায়?”
জঙ্গল ছলিমপুরের ওই হামলার সঙ্গে এবং জায়গা দখলের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের চিহ্নত করার কথাও বলেন মন্ত্রী।
এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা নেওয়া হয় জঙ্গল ছলিমপুর ও আলীনগর এলাকায়।
বিপুল পরিমাণ পুলিশ, র্যাব, বিজিবি মোতোয়েন করার পাশাপাশি অলি গলির মুখে পুলিশি পাহাড়া বসানো হয়।
সংশোধন করা হবে কিছু আইন
মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজির মত বিষয়গুলোকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এগুলোকে আমরা নির্মূল করার চেষ্টা করব। তার জন্য আমরা আইনি সংস্কার করছি।”
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ১৮৬৭ সনের জুয়া আইনের মাধ্যমে জুয়া নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
“এখন জুয়া, অনলাইন জুয়া, অফলাইন জুয়া—বিভিন্ন রকমের মডারেট জুয়া এবং বেটিং এগুলো চালু হয়েছে, এগুলোকে আমরা কখনোই আইনিভাবে অ্যাড্রেস করতে পারছি না বিকজ আইনটাই নাই, আইনটাই দুর্বল।
“সেই আইনটা আমরা আগামী সেশনে, পার্লামেন্টে নিয়ে আসার চেষ্টা করব। তাহলে আইনি কাঠামোগতভাবে এগুলোকে আমরা অ্যাড্রেস করব।”
পাশাপাশি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মাদক মামলার বিচার করার সুযোগ তৈরি করতে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করার কথা বলেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, “এখানে হাজার হাজার মাদকের মামলা আছে, যেগুলো পেন্ডিং হয়ে আছে বছরের পর বছর; সেগুলো নিষ্পত্তি হবে। এভাবেই আমরা আমাদের দেশকে বাঁচাতে পারি, যুবসমাজকে বাঁচাতে পারি।”
কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বন্ধেও কিছু আইনি সংস্কার আনতে হবে বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “কিশোর গ্যাং বলতে কত বয়স পর্যন্ত, তাদেরকে কীভাবে কী সুবিধা দেওয়া যায়, কারণ আইনের ফাঁকফোকর গলেই কিশোরদের যে সুবিধা আছে, জুভেনাইল ডিলিংকুয়েন্সির যে সুবিধা আছে, সেটা তারা নিচ্ছে এবং এই কিশোররা যারা কিশোর গ্যাংয়ে জড়িত, তারা ক্রমান্বয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। সুতরাং এখানে আইনি সংস্কার দরকার আছে।”
অন্যদের মধ্যে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মো. হেলাল উদ্দিন, পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরসহ বিভিন্ন বাহিনী ও দপ্তরের প্রধানরা পরিদর্শনের সময় মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।