
ঢাকার সাভার উপজেলার আমিনবাজার সংলগ্ন বড় বরদেশী মৌজার আওয়াল মার্কেট এলাকার সিলিকন আবাসন প্রকল্পের ভেতরে কয়েকটি অবৈধ কারখানায় পুরোনো ব্যাটারির প্লেট পুড়িয়ে সিসা উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই এসব কারখানায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া, সিসার কণা ও এসিডের ঝাঁজালো গন্ধে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারখানাগুলোর সঙ্গে গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার চার ব্যক্তি—মানিক সরকার, মহসিন, রেজোয়ান ও রতনের নাম সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কাউসার আহমেদ, রুহুল আমিনসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, প্রতিদিন রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ছয়টি চুলায় পুরোনো ব্যাটারির প্লেট পুড়িয়ে সিসা উৎপাদন করা হয়। এ সময় নির্গত এসিডের ঝাঁজালো ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ দুই থেকে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নারী, শিশু ও বয়স্কদের চোখ-মুখে জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট এবং নানা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণ চললেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ার কারণে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, কারখানা-সংশ্লিষ্টদের হয়ে কিছু সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি মামলা, হামলা এবং মারধরের ভয় দেখিয়ে স্থানীয়দের মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বিষাক্ত ধোঁয়া, সিসার কণা ও রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, চোখে জ্বালাপোড়া ও মাথাব্যথার মতো সমস্যা বাড়ছে। পাশাপাশি কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, বিল ও জলাশয়ের মাছের ক্ষতি হচ্ছে এবং গাছপালা ও ফলের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এতে কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
অভিযোগের বিষয়ে কারখানার সমন্বয়ক মানিক সরকারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন বা বৈধ কাগজপত্র না থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, **”আমাদের কোনো কাগজপত্র নেই। সবাইকে ম্যানেজ করেই কারখানা চালাই। আপনি চাইলে সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন অথবা সাভারের যেকোনো কর্মকর্তাকে জানাতে পারেন। যারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন, তাদের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে।”**
পরিবেশবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, পুরোনো ব্যাটারির প্লেট পুড়িয়ে সিসা উৎপাদনের সময় বাতাসে সিসার অতিক্ষুদ্র কণা, সালফিউরিক এসিডের বাষ্পসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন এসব উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়া, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা হ্রাস, স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি, রক্তস্বল্পতা, কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এ ধরনের দূষণ অত্যন্ত বিপজ্জনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অবৈধ কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিক বর্জ্য মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত করে। ফলে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যায়, ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়, জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে পুরো এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। তারা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবৈধ কারখানা বন্ধ, উৎপাদন সামগ্রী জব্দ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এছাড়া ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তর ও ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়, সাভার উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ কারখানাগুলো বন্ধ, মালামাল জব্দ এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড রোধে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।