
উৎপল রক্ষিত, গাজীপুর প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের চিকিৎসা অঙ্গনে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কর্ম, ত্যাগ ও মানবিকতা তাঁদেরকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। তাঁদেরই একজন ডাঃ প্রদীপ কুমার রায়। প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নিরলসভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন মির্জাপুর তথা দেশের অসংখ্য মানুষের আস্থার প্রতীক। সাফল্য, সম্মান কিংবা ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে মানুষের সেবাকেই তিনি জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
১৯৪৫ সালের ২৯ মার্চ কুমিল্লা জেলার (বর্তমান) হোমনা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ডাঃ প্রদীপ কুমার রায়। তাঁর পিতা সুরেশ চন্দ্র রায় ছিলেন কুমুদিনী ট্রাস্টের একজন ম্যানেজার। পেশাগত কারণে পরিবারটি নারায়ণগঞ্জে বসবাস শুরু করে। ফলে জন্ম কুমিল্লায় হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা, শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নারায়ণগঞ্জেই।
শিক্ষাজীবনের শুরু নারায়ণগঞ্জে। তিনি জয়গোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে মাধ্যমিক (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে নারায়ণগঞ্জের তুলারাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ভর্তি হন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এবং ১৯৭৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
তবে চিকিৎসক হওয়া ছিল না তাঁর শৈশবের স্বপ্ন। তিনি মূলত প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় ১৯৬২ সালে। সে সময় বাবার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন মির্জাপুর দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা-এর বাড়িতে। সেখানে রণদা প্রসাদ সাহা তাঁর পিতা সুরেশ চন্দ্র রায়কে পরামর্শ দেন—“প্রদীপকে ডাক্তারি পড়াও।” সেই পরামর্শই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয় এবং পিতার আগ্রহে তিনি চিকিৎসা শিক্ষায় এগিয়ে যান।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। যদিও তিনি সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তবুও ভারতের কুচবিহার শরণার্থী ক্যাম্পে অসংখ্য শরণার্থীর চিকিৎসাসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। যুদ্ধের বিভীষিকা ও মানুষের দুর্দশা খুব কাছ থেকে দেখে তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের বাকি সময় অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন।
চিকিৎসক হিসেবে ১৯৭৩ সালেই যোগ দেন কুমুদিনী হাসপাতাল-এ। কর্মজীবনে বহু আকর্ষণীয় সুযোগ পেলেও তিনি কখনো কুমুদিনী হাসপাতাল ছেড়ে যাননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৃত চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় পরিচয় মানুষের পাশে থাকা।
সার্জারিতে দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা-এ যান। সেখানে উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর দেশে ফিরে আবারও কুমুদিনী হাসপাতালেই যোগ দেন এবং নতুন উদ্যমে রোগীদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “মির্জাপুরের মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমি মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে আছি।”
বয়সের ভারে আগের মতো কাজ করতে না পারলেও তাঁর কর্মস্পৃহা আজও অটুট। এক সময় প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ৯টি বড় অপারেশন করতেন। এমনকি করোনা মহামারির কঠিন সময়েও একদিনে ১৭টি পর্যন্ত অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, “যতদিন শারীরিকভাবে সক্ষম থাকব, ততদিন কুমুদিনীতে বসে মানুষের সেবা করে যেতে চাই।”
পারিবারিক জীবনেও তিনি সফল। ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর ছেলে ডাঃ পার্থ রায় অর্থোপেডিক সার্জারিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং কুমুদিনী মেডিকেল কলেজের সঙ্গে যুক্ত। বড় মেয়ে একজন চিকিৎসক ছোট মেয়ে একটি চাইল্ড কেয়ারে কর্মরত দুজনই বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত ।
দীর্ঘদিনের অবদান ও মানবিক চিকিৎসাসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ মির্জাপুর প্রেস ক্লাব এবং কিংশুক তাঁকে সম্মাননা প্রদান করেছে।
প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়নও অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি বলেন, কুমুদিনী হাসপাতালে যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উন্নয়ন তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। ভবিষ্যতেও প্রতিষ্ঠানটির উত্তরোত্তর উন্নতি ও সাফল্য কামনা করেন।
নিরহংকার জীবন, অসাধারণ কর্মনিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার কারণে ডাঃ প্রদীপ কুমার রায় আজ শুধু একজন দক্ষ সার্জন নন, তিনি একটি অনুপ্রেরণার নাম। কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার সফল অস্ত্রোপচার এবং অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষায় তাঁর অবদান তাঁকে চিকিৎসক সমাজে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
ডাঃ প্রদীপ কুমার রায়ের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—চিকিৎসা কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানবতার সেবা করার এক মহান অঙ্গীকার। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, আত্মত্যাগ এবং মানবিকতা আগামী প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।