
নিজস্ব প্রতিবেদক, আশুলিয়া : ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ার শিমুলিয়া ইউনিয়নের শহীদনগর, গোহাইলবাড়ী রোডে অবস্থিত S.H. FASHION নামের একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের স্বল্প বেতন প্রদান, আইনবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা করানো, শিশু শ্রম ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও একাধিক শ্রমিকের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে শ্রমিকদের প্রতিদিন শ্রম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হয়। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উৎপাদন কার্যক্রম চললেও অতিরিক্ত সময়কে ওভারটাইম হিসেবে গণ্য করা হয় না। ফলে শ্রমিকরা অতিরিক্ত সময় কাজ করলেও শ্রম আইন অনুযায়ী প্রাপ্য ওভারটাইম ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি, প্রতিদিন অতিরিক্ত চার ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হলেও সেই সময়ের জন্য পৃথক কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। একই সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি, অতিরিক্ত কাজের হিসাব এবং অন্যান্য শ্রমিক সুবিধাও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না বলে অভিযোগ করেন তারা।
বেতন কাঠামো নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শ্রমিকরা। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে শ্রমিকদের মাসিক বেতন মাত্র ৬ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই বেতন বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও প্রচলিত শ্রম আইনের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি একজন সাধারণ হেলপার বা সহকারীর বেতনের কাছাকাছি।
এছাড়া স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের দিয়েও বিভিন্ন ধরনের কাজ করানো হচ্ছে। যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে তা দেশের প্রচলিত শ্রম আইন, শিশু শ্রম নিরসন নীতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রম মানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. শফি আলমের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দীর্ঘ সময় শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে ন্যায্য পারিশ্রমিক প্রদান করা হয় না। এছাড়া তিনি নিজেকে একজন ইউটিউবার হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, S.H. FASHION পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নেই। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পাশাপাশি ভবনটিতে গার্মেন্টস কারখানা পরিচালনার জন্য ফায়ার সার্ভিস, বিজিএমইএ (BGMEA) এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE)-এর প্রয়োজনীয় অনুমোদনও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, একজন নিয়োগকর্তার দায়িত্ব হলো শ্রমিকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত সময় কাজ করালে আইন অনুযায়ী ওভারটাইম ভাতা প্রদান করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ বজায় রাখা এবং শ্রমিকদের অন্যান্য আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে শিশু শ্রম ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে S.H. FASHION-এর মালিক মো. শফি আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, এটি কোনো গার্মেন্টস কারখানা নয়; বরং একটি জুটের গোডাউন।
তবে প্রতিবেদকের সরেজমিন পরিদর্শনে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। গোডাউন হিসেবে পরিচয় দেওয়া ভবনের ভেতরে পোশাক তৈরির বিভিন্ন কার্যক্রম চলতে দেখা যায়। সেখানে একাধিক শ্রমিককে সেলাই মেশিনে কাজ করতে, পোশাক কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিংয়ের কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। ফলে স্থানীয়দের অভিযোগ, জুটের গুদামের আড়ালে সেখানে পোশাক শিল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE), ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।