
গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধিঃ
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদারীপুরের কালকিনি ও বরিশালের গৌরনদী এলাকার দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, বোমাবাজি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় অন্তত ১৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে এ সংঘর্ষ চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, আহত ব্যক্তি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের একটি লোকাল বাসের কাউন্টারে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টিকিট কাটাকে কেন্দ্র করে টিকিট মাস্টার ঝন্টু দাস (৬৫) ও মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার মসজিদবাড়ি এলাকার হাবুল বেপারীর (৪৭) মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। এর জেরে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে দুই এলাকার লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে তা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও বোমাবাজিতে রূপ নেয়।
সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে শামছুল হক (৪৮), স্বজল বেপারী (২৫), মিজান মুন্সী (৪৫), ইস্রাফিল (৩৫), সিদ্দিক সরদার (৫০), তমাল, সজীব হোসেন ও হুমায়ুন কবির (৫২) রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহত পাঁচজনকে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য আহতদের গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় কালকিনি এলাকার লোকজন ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের অন্তত ১৫টি দোকানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর মধ্যে মুদি, পার্স ও ভ্যারাইটি স্টোর রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, লুট হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা।
ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী সিদ্দিক সরদার বলেন, ‘কালকিনির মসজিদবাড়ি এলাকার ৬০ থেকে ৭০ জন লোক ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ভূরঘাটায় হামলা চালায়। পরে গৌরনদীর কিছু যুবক তাঁদের প্রতিহত করতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়।’
গৌরনদী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক কাওছার তালুকদারের অভিযোগ, কালকিনির মসজিদবাড়ি এলাকার মোফাজ্জেল সরদার ও বায়জীদ সরদারের নেতৃত্বে লোকজন অস্ত্র, বোমা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ভূরঘাটায় হামলা চালায়। তিনি কালকিনি থানা পুলিশের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতের অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কালকিনির মোফাজ্জেল হোসেন। তিনি বলেন, গৌরনদীর লোকজন প্রথমে কালকিনিতে হামলা চালানোর পর পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে।
ডাসার থানার যুবদলের সদস্যসচিব বায়জীদ সরদারও অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, টিকিট কাউন্টারের ঘটনার মীমাংসা করতে শুক্রবার রাতে ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডে গেলে তাঁকে লাঞ্ছিত করা হয়। বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর কালকিনির লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে গৌরনদীর লোকজন কালকিনির মসজিদবাড়িতে হামলা চালিয়ে পাঁচজনকে আহত করে। এর পর সহস্রাধিক মানুষ পাল্টা হামলা চালায়। তবে গৌরনদীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা বা লুটপাটের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম বলেন, তাঁরা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছেন। পক্ষপাতের অভিযোগ সঠিক নয়।
গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। সংঘর্ষ এড়াতে ভূরঘাটা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংঘর্ষের পর রাত সাড়ে নয়টার দিকে কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিশোর কুমার, কালকিনি থানার ওসি জহিরুল আলম, ডাসার থানার ওসি সোলায়মান মাহমুদ এবং গৌরনদী মডেল থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে ভূরঘাটা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।