
জাহিদুল ইসলাম, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধিঃ সুন্দরবনের গহিনে কোস্টগার্ডের সঙ্গে দুর্ধর্ষ বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এ অভিযানে বাহিনীটির এক সক্রিয় সদস্য নিহত হয়েছেন এবং গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়েছে কুখ্যাত বাহিনী প্রধান রবিউল ইসলামকে। এছাড়া বন থেকে পালিয়ে লোকালয়ে আশ্রয় নেওয়ার সময় আরও এক গুলিবিদ্ধ দস্যুকে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় জনতা।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) গভীর রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন ‘ময়দাফেসা খাল’ এলাকায় এ শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে সুন্দরবনের ওই অঞ্চলে কোস্টগার্ডের বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কোস্টগার্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের কয়রা কোস্টগার্ড টহল ফাঁড়ির একটি দল নিয়মিত টহল দেওয়ার সময় ময়দাফেসা খাল এলাকায় দস্যুদের উপস্থিতি টের পায়।এ সময়ে কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে বনদস্যুরা অতর্কিত গুলি বর্ষণ শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে কোস্টগার্ডও পাল্টা গুলি চালালে উভয়পক্ষের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়।
গোলাগুলির একপর্যায়ে দস্যুরা বনের ভেতরে পিছু হটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে সাখওয়াত সরদার (৬০) নামে এক দস্যুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত সাখওয়াত কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের এজাহার সরদারের ছেলে।
একই স্থান থেকে গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহত অবস্থায় আটক করা হয় ‘দুলাভাই বাহিনী’র প্রধান রবিউল ইসলামকে (৫০)। তিনি মহেশ্বরীপুর এলাকার মানিক গাজীর ছেলে। শুক্রবার সকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের তাড়া খেয়ে বনের ভেতরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পালিয়ে যান ইস্রাফিল হাওলাদার (২৭) নামের আরেক দস্যু। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি উপজেলার বাবুরাবাদ গ্রামে আত্মগোপন করার চেষ্টা করলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে গ্রামবাসী তাকে অবরুদ্ধ করে মঠবাড়ী পুলিশ ফাঁড়িতে সোপর্দ করে। ইস্রাফিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আড়ানী বাগালী গ্ৰামের ইসমাইল হাওলাদারের ছেলে। তাকে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আকবর হোসেন জানান, সুন্দরবনের একসময়ের ত্রাস ‘ইলিয়াস বাহিনী’র প্রধান বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর এই নতুন দলের উত্থান ঘটে। নিহত ইলিয়াসের ভগ্নিপতি (বোনের স্বামী) রবিউল ইসলাম দলছুট দস্যুদের একত্র করে নতুন বাহিনী গড়ে তোলেন। ইলিয়াসের ‘দুলাভাই’ হওয়ার কারণে স্থানীয় জেলেরা রসিকতা করে এই দলের নাম দেয় ‘দুলাভাই বাহিনী’। দীর্ঘদিন ধরে এই বাহিনী সুন্দরবনের জেলে ও বাওয়ালিদের অপহরণ ও চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোঃ শাহ আলম জানান, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে গোলাগুলি ও একজন নিহতের খবর তারা পেয়েছেন। তবে পুরো বিষয়টি যেহেতু কোস্টগার্ডের এখতিয়ারে, তাই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছেন। আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ শরিফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, “বনদস্যুদের দমনে কোস্টগার্ডের অভিযানটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিস্তারিত তথ্য কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।”
কোস্টগার্ড সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে তাদের এই বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। বনের ভেতর এখনো তল্লাশি চলছে। অভিযান শেষ হলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র সামগ্রীসহ পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হবে।