
জেব্রা ক্রসিং, স্পিড ব্রেকার ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডের অভাবে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা; দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি এলাকাবাসীর দাবি।
মোঃ শফিকুল ইসলাম, গৌরনদী (বরিশাল):
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বার্থী বাজারের বুক চিরে চলে গেছে ভাঙ্গা–বরিশাল–কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়ক। মহাসড়কের দুই পাশজুড়ে গড়ে উঠেছে বার্থী বাজার, বার্থী তারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বার্থী ডিগ্রি কলেজ, একটি মাদরাসা, মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, ব্যবসায়ী, মুসল্লি ও সাধারণ মানুষ এই মহাসড়ক পার হয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপদ পারাপারের জন্য নেই জেব্রা ক্রসিং, স্পিড ব্রেকার, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ কিংবা পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের ফাঁক গলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন বাজি রেখে রাস্তা পার হতে হয়। সন্তান নিরাপদে বিদ্যালয়ে পৌঁছাবে কি না—এই উৎকণ্ঠায় প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকেন অভিভাবকরা। একটি ছোট ভুল বা সামান্য অসতর্কতাই কেড়ে নিতে পারে একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মহাসড়কটি এখন কার্যত একটি “মৃত্যুফাঁদ”। এখানে নেই “সামনে স্কুল”, “ধীরে চলুন”, “শিক্ষার্থী পারাপার” বা নির্ধারিত গতিসীমার কোনো সুস্পষ্ট সাইনবোর্ড। ফলে যানবাহন অধিকাংশ সময়ই বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে এবং প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বার্থী তারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক গবিন্দ চন্দ্র নাগ বলেন, “প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী এই মহাসড়ক পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের রাস্তা পারাপারের সময় আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন থাকি। শুধু জেব্রা ক্রসিং করলেই হবে না, ফুটপাত দখলমুক্ত করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্কুলসংলগ্ন এলাকায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
বার্থী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক জহির উদ্দিন দোলন বলেন, “আমাদের কলেজের শিক্ষার্থীরাও প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়ক পারাপার করে। এখানে অবিলম্বে জেব্রা ক্রসিং, স্পিড ব্রেকার এবং ‘সামনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ ও ‘ধীরে চলুন’ লেখা সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আমাদের জোর দাবি, দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে ফুটপাত দখলের অভিযোগ। মহাসড়কের দুই পাশের অনেক জায়গায় বালু, ইট, কাঠ, নির্মাণসামগ্রী এবং বিভিন্ন পণ্য রেখে ব্যবসা পরিচালনা করায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়ক ব্যবহার করছেন।
বার্থী বাজারের ব্যবসায়ী মো. কামরুল ইসলাম খান বলেন, “ফুটপাত পথচারীদের জন্য, কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এতে শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের বাধ্য হয়ে মহাসড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করলে সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত হবে।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, এ এলাকায় সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় স্থানে স্পিড ব্রেকার, জেব্রা ক্রসিং, গতিনিয়ন্ত্রণমূলক রাম্বল স্ট্রিপ এবং দৃশ্যমান সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের নিয়মিত নজরদারি এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, কোনো বড় দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীর প্রাণহানির পরই কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষিত হবে? দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই তো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের একটাই আবেদন, দুর্ঘটনার পর নয়, দুর্ঘটনার আগেই ব্যবস্থা নিন। বার্থী বাজারকে নিরাপদ করুন, শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা করুন।”