
৪০৫ রান তাড়া করতে হবে। ওয়ানডে ক্রিকেটে অসম্ভব একটি লক্ষ্যমাত্রা। লক্ষ্যের কথা শুনলেই তো পিলে চমকে যাওয়ার কথা। কিন্তু দলটির নাম যে ভারত! যে দলে সব সময়েই বিশ্বের সেরা ব্যাটারদের মজুদ থাকে। তাদের মধ্যে কেউ না কেউ ঠিকই বিশাল লক্ষ্য পাড়ি দিয়ে ম্যাচ বের করে নিয়ে আসেন।
৪০৫ রানের পাহাড় সমান স্কোর তাড়া করতে নেমে এবার ব্যাট হাতে জ্বলে উঠলেন ভারতীয় অধিনায়ক শুভমান গিল। তার ব্যাটে হলো রেকর্ডের পর রেকর্ড। অপরাজিত ২২৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ৪০৬ রানের লক্ষ্য মাত্র ৪৩.৩ ওভারেই (৩৯ বল হাতে রেখে) পেরিয়ে গেল ভারত। ওয়ানডে ক্রিকেটে ৪০০-এর বেশি রান তাড়া করে জয়ের মাত্র দ্বিতীয় ঘটনা এটি।
গুয়াহাটিতে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ আগে ব্যাট করে তিন সেঞ্চুরির ওপর ভর করে ৭ উইকেটে ৪০৫ রান করেছিল। জবাবে ভারত ২ উইকেট হারিয়ে ৪০৬ রান করে জয় নিশ্চিত করে। গিল ২২৩ রানে অপরাজিত থাকেন, আর রোহিত শর্মা করেন ১০১ রান। ভারতের জয়ের ব্যবধান ৮ উইকেট।
এই ইনিংসের মাধ্যমে শুভমান গিল ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির মালিক হলেন। ১১৭ বল খেলে ২৪টি বাউন্ডারি ও ৭টি ছক্কায় ডাবল সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। রান তাড়া করতে নেমে এটা ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসও। অধিনায়ক হিসেবে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ডও গড়েছেন ২৭ বছর বয়সী এই ব্যাটার।
গিলের সঙ্গে ভারতের ইনিংসের বড় জুটি গড়েছেন রোহিত শর্মা। ওয়ানডেতে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি করা একমাত্র অন্য ব্যাটার রোহিত। ফলে দুই ডাবল সেঞ্চুরিয়ান একই ইনিংসে ভারতের হয়ে এমন দাপুটে রান তাড়ার অংশ হলেন। ওপেনিংয়ে ২৫৫ রানের জুটি গড়েন রোহিত এবং শুভমান। যা ওয়ানডেতে ভারতের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি।
এই ম্যাচটি ওয়ানডে ইতিহাসেও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমবারের মতো একটি ওয়ানডেতে পাঁচটি সেঞ্চুরি হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ছিল ভারত–ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ানডে ইতিহাসের পাঁচটি দ্রুততম সেঞ্চুরির তালিকায়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে তিন ব্যাটার সেঞ্চুরি করেছেন। আমির জাঙউ করেন ১১৪, শাই হোপ ১০৪ এবং জন ক্যাম্পবেল করেন ১০১ রান। তাদের তিন সেঞ্চুরিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর পৌঁছে যায় ৪০৫-এ।
তবে সেই বিশাল সংগ্রহও ভারতের সামনে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। শুরু থেকেই লক্ষ্য তাড়ায় আগ্রাসী ছিল ভারত। রোহিতের সেঞ্চুরির পর গিল নিজের ইনিংসকে আরও বড় করেন এবং শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ২২৩ রানে পৌঁছে যান।
গুয়াহাটির উইকেটও ব্যাটারদের জন্য ছিল আদর্শ। বোলারদের জন্য প্রায় কিছুই ছিল না- সুইং সামান্য, সিম মুভমেন্ট কম, টার্ন ছিল প্রায় নেই বললেই চলে। বাউন্সে বড় ধরনের পরিবর্তন ছিল না, বলের গতিও কমেনি। এমনকি রিভার্স সুইংয়েরও দেখা মেলেনি।
দ্রুতগতির আউটফিল্ডও রান তোলাকে সহজ করে দেয়। অনেক সময় ব্যাটাররা শুধু প্রতিরোধমূলক শট খেললেও বল দ্রুতগতিতে সীমানা পেরিয়ে চার হয়ে যায়। তবে এমন পরিবেশেও ৪০০-এর বেশি রান তাড়া করতে প্রয়োজন ছিল দক্ষতা, শৃঙ্খলা, আগ্রাসন, রান করার ক্ষুধা এবং শারীরিক সক্ষমতা। গিল সেই সবকিছুরই অসাধারণ সমন্বয় দেখিয়েছেন।
২৭ বছর বয়সেই ওয়ানডেতে ৬৯ ম্যাচে ১১টি সেঞ্চুরি ও ৩১টি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস রয়েছে গিলের। এই ম্যাচে তার ২২৩ রান শুধু ভারতের জয় নিশ্চিত করেনি, ওয়ানডে ক্রিকেটে তার বর্তমান অবস্থানকেও নতুন করে তুলে ধরেছে।
ভারতের বোলারদের মধ্যে কুলদীপ যাদবের পরিসংখ্যানও নজর কেড়েছে। ১০ ওভারে ৬৫ রান দিয়ে ২ উইকেট নিয়েছেন তিনি। রান বেশি দেওয়ার পরও তার এই ম্যাচটি ছিল ব্যক্তিগত মাইলফলকের। তিনি ভারতের দ্বিতীয় দ্রুততম বোলার হিসেবে ওয়ানডেতে ২০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
নামান ধিরও দলের জন্য কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। পার্টটাইম অফস্পিনে ৬.১ ওভার বোলিং করে মাত্র ৩৮ রান দিয়েছেন তিনি। তবে পরে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে।
ভারতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অভিষিক্ত অকিব নবীর প্রত্যাবর্তন। প্রসিধ কৃষ্ণা চোট পাওয়ার পর মাত্র পাঁচ ওভার বোলিং করেই মাঠ ছাড়েন। তাঁর জায়গায় অকিব নবীকে আবার বোলিংয়ে ফিরতে হয় এবং ভারতের বোলিং আক্রমণকে সামলাতে সাহায্য করেন তিনি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের শেষ ১১ ওভারে ৮২ রান উঠলেও তারা হারায় ৫ উইকেট। শেষ দিকের এই ধস শেষ পর্যন্ত ভারতের জন্য পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। কারণ শেষ ১১ ওভারে উইকেটগুলো না পড়লে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ আরও বড় হতে পারত এবং ভারতের সামনে রান তাড়াটা হয়তো এতটা সহজ থাকত না।
কিন্তু গিলের অসাধারণ ব্যাটিংয়ে শেষ পর্যন্ত সব হিসাবই সহজ হয়ে যায়। ৪০৬ রানের লক্ষ্যকে মাত্র ৪৩.৩ ওভারে পেরিয়ে ভারত শুধু বড় জয়ই পায়নি, ওয়ানডে ক্রিকেটে রেকর্ডের পাতাতেও জায়গা করে নিয়েছে গিলের ২২৩ রানের ইনিংস।