
সম্রাট আলাউদ্দিন, ধামরাই (ঢাকা) : বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস কৃষি। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকার ধামরাইয়ে কালের বিবর্তনে ইটভাটা ও অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কৃষিজমি। ফলে দিন দিন কমছে আবাদি জমির পরিমাণ।
একসময় ধামরাই উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদনের অপার সম্ভাবনা ছিল। গ্রামীণ জনপদে দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ক্রমাগত কৃষিজমি বিনষ্ট হওয়ায় সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। কৃষিজমির অনেক অংশ মাটি কেটে পুকুরে পরিণত হয়েছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বিভিন্ন কল-কারখানা নির্মাণ, ইটভাটা স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপনের ফলে আশপাশের জমি ও পরিবেশের ওপরও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। এতে জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

ইটভাটা-অপরিকল্পিত শিল্পের আগ্রাসনে ধামরাইয়ে সংকুচিত কৃষিজমি
এ ছাড়া কৃষিজমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করার কারণে অনেক এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে পুকুর ও নিচু জমি। এভাবে ধীরে ধীরে ধামরাইয়ের কৃষিজমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ধামরাই উপজেলার জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ। উপজেলার মোট ভূমির একটি বড় অংশ কৃষিজমি। কৃষি উপযোগী এই উপজেলায় ইটভাটা ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে কৃষিজমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একসময় ধামরাইয়ের গ্রামীণ জনপদের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। উপজেলার বেশির ভাগ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু ইটভাটা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের আগ্রাসনে খাদ্যের প্রধান উৎস কৃষিজমি এখন অস্তিত্ব সংকটে। কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের সংখ্যাও কমছে। এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে ভবিষ্যতে ধামরাইয়ে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যমতে, ধামরাইয়ে ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১২ হাজার ৪১৮ জন। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ১৭ হাজার ১৩৫ জনে। বর্তমানে উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। অর্থাৎ একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে কৃষিজমির পরিমাণ।
কৃষি অফিসের তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ধামরাই উপজেলায় আবাদি ও অনাবাদি মিলিয়ে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৮০০ হেক্টর। ২০২০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৬ হেক্টরে। ২০২৫ সালে কৃষিজমির পরিমাণ আরও কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ২৬০ হেক্টরে। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে ধামরাইয়ে কৃষিজমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ধামরাই উপজেলায় প্রায় ১৮০টি ইটভাটা এবং ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০টি শিল্পকারখানা রয়েছে বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত ঘরবাড়ি, শিল্পকারখানা ও ইটভাটা স্থাপনের কারণে মাটির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ফলে দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে আবাদি জমির পরিমাণ।
এত কিছুর পরও ধামরাইয়ে উৎপাদিত ফসল স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। তবে কৃষিজমি এভাবে কমতে থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিজমি কমে যাওয়ায় পরিবেশের ওপরও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
তাই এখনই কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় একসময় ইট-পাথরের দালানকোঠায় হারিয়ে যেতে পারে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ঐতিহ্য। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও কৃষিজমির ভূমিকা অপরিসীম।
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, কৃষিজমি রক্ষায় মানুষকে সচেতন হতে হবে। কৃষিজমিতে ইটভাটা, কল-কারখানা ও পুকুর খনন করা যাবে না। কৃষিজমি রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। পরিবেশ রক্ষায় কৃষিজমির ভূমিকা অপরিহার্য।