
নিজস্ব প্রতিবেদক ।।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার দুই যুবককে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, কম্বোডিয়ায় নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন বঞ্চনা, জিম্মি করে রাখা এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়াতে বাধ্য করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বেপারী ও তার ছেলে ছিয়াম হোসেনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বর্তমানে তারা কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন (Phnom Penh) শহরে চরম অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত নাহার ইন্টারন্যাশনাল, চাঁদনী ইসলাম মালেক ম্যানশন, ১২৮ মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ নামের একটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
ভুক্তভোগী আরিফ হোসেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের বাসাইল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি খুদে বার্তা ও মুঠোফোনে দেওয়া বক্তব্যে অভিযোগ করেন, তাকে বৈধ কম্পানির অফিসিয়াল কম্পিউটারভিত্তিক চাকরি, মাসিক প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেতন-কমিশন এবং এক বছরের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
এসব প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে চার দফায় তার কাছ থেকে মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তিনি দেখতে পান, প্রতিশ্রুত চাকরির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। তার অভিযোগ, অফিসিয়াল চাকরির পরিবর্তে তাকে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথিত ঋণ (লোন) দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের কাজে ব্যবহার করা হয়।
আরিফের দাবি, তাকে এক বছরের ভিসা দেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র তিন মাসের ভিসা দেওয়া হয়। পরে ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে মারধর করা হয় এবং ভয়ভীতি দেখানো হয়। তিনি অভিযোগ করেন, তার পাসপোর্ট তাদের নিয়ন্ত্রণে। চার মাসের বেশি সময় কাজ করার পরও তার পাওনা বেতনের বড় অংশ পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমানে তিনি ৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা বেতন পাওনা রয়েছেন বলে দাবি করেন। তার ভাষ্যমতে, বেতন ও বৈধ কাগজপত্রের দাবি জানালে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
এদিকে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের পূর্ব সুজনকাঠী গ্রামের বাসিন্দা সৌরভ মোল্লা।
তার পরিবারের দাবি, সৌরভকে বিদেশে পাঠানোর জন্য মোট ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তাকে বৈধ প্রতিষ্ঠানে অফিসিয়াল চাকরি ও মাসিক এক লাখ টাকা বেতনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।কিন্তু প্রায় ৫ মাস অতিবাহিত হলেও তাকে কোনো বেতন দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং বিদেশে থাকা অবস্থায় তার খরচ চালানোর জন্য পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে কয়েক দফায় টাকা পাঠাতে হয়েছে।
আরিফ অভিযোগ করেন, কম্বোডিয়ায় গিয়ে তিনি কামাল হোসেন ও সিয়ামের এমন একটি চক্রের কার্যক্রম দেখতে পান, যারা বিভিন্ন ধরনের সাইবার প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তার দাবি অনুযায়ী, চক্রটি বিভিন্ন ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ-নগদ) সংক্রান্ত প্রতারণা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো অপরাধে জড়িত। তিনি আরও দাবি করেন, চক্রটির অধীনে একাধিক টিম কাজ করে এবং তাকেও এসব কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে আপত্তি জানালে এবং নিজের পাওনা বেতন ও বৈধ কাগজপত্র দাবি করলে তার ওপর নির্যাতন বাড়ানো হয়। আরিফের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কাউকে কিছু জানালে তাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না এবং প্রাণনাশের ঝুঁকি রয়েছে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
আরিফের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমার ছেলে আরিফই সংসারের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক কষ্টে ধার-দেনা করে, জমিজমা ও সহায়-সম্বল বিক্রি করে তাকে বিদেশ পাঠিয়েছি। কিন্তু দালালদের খপ্পরে পড়ে আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। আমার ছেলে এখন কম্বোডিয়ায় অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তাকে মারধর করা হয়েছে, মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে এবং তার প্রাপ্য বেতনও দেওয়া হয়নি। আমি সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, আমার ছেলেকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
সৌরভের বাবা মো. জাহাঙ্গীর মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, ভাগ্যের চাকা বদলের আশায় ধার-দেনা করে ও জমিজমা বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। দালালের চক্করে পড়ে আজ আমি সর্বস্বান্ত। প্রায় ছয় মাস হয়ে গেছে, আমার ছেলে কোনো বেতন পায়নি। উল্টো তার খরচের জন্য দেশ থেকে টাকা পাঠাতে হয়েছে। আমার ছেলেকে বৈধ কোম্পানির অফিসিয়াল কাজ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তাকে বিভিন্ন অনৈতিক ও অবৈধ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানতে পেরেছি। আমি প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, আমার ছেলেকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।”
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিখন বণিকের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, বেতন বঞ্চনা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিখন বণিক বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করা হবে। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু দুই প্রবাসী যুবকের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনা নয়; বরং বিদেশের মাটিতে বসে সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধ, মানবপাচার-সদৃশ কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের ভয়াবহ চিত্রও সামনে আনতে পারে। তাদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি বৈধ প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য বড় হুমকি। তারা অবিলম্বে বিষয়টি তদন্ত করে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পাওনা অর্থ আদায়ে সহায়তা করা, প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, সিআইডি, পুলিশ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনের সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুই ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ছিয়াম হোসেন মুঠোফোনে বলেন, ভুক্তভোগী আরিফকে তিনি বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন এবং অপর ভুক্তভোগী সৌরভকে তার বাবা কামাল হোসেন বিদেশে নিয়েছেন। দুই যুবককে জোরপূর্বক অবৈধ বা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার অভিযোগের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, তাদেরকে কনস্ট্রাকশন (নির্মাণ) খাতে কাজের উদ্দেশ্যে ভিসা দেওয়া হয়েছিল। তবে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর তারা নির্মাণকাজে যুক্ত না হয়ে নিজেরাই অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে বেতন-ভাতা পরিশোধ না করা, পাওনা অর্থ আটকে রাখা এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি এবং প্রশ্ন এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য বৈধ কাগজপত্র নিজেদের হেফাজতে রেখে দেওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন ছিয়াম হোসেন। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ সঠিক নয়।