
জাহিদুল ইসলাম, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধিঃ
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে অবৈধভাবে নাইন্টি (পাইপলাইন) বসিয়ে শাকবাড়িয়া নদী থেকে লবণ পানি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে মাছের ঘেরে নদীর লবণ পানি তুলছে। এতে একদিকে দুর্বল হয়ে পড়ছে উপকূল রক্ষার প্রধান বেড়িবাঁধ, অন্যদিকে নোনা পানির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি ও ধানচাষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়রা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর কয়রা দক্ষিণপাড়া এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরে পুনঃসংস্কার করা বেড়িবাঁধের ওপর দিয়েই একাধিক স্থানে অবৈধ নাইন্টি স্থাপন করা হয়েছে। এসব পাইপের মাধ্যমে শাকবাড়িয়া নদী থেকে লবণ পানি তুলে পাশের মাছের ঘেরে নেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কৃষক জানান, বর্ষা মৌসুমে তারা আমন ধানের আবাদ করেন। কিন্তু মাছের ঘেরে উত্তোলিত লবণ পানি বিভিন্ন ছিদ্র ও পানি চলাচলের পথ দিয়ে কৃষিজমিতে প্রবেশ করায় ধানের চারা ঠিকমতো বেড়ে ওঠে না। অনেক ক্ষেত্রে চারা নষ্ট হয়ে যায়, ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অবৈধ নাইন্টি ও পাইপের কারণে বেড়িবাঁধের স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, অতীতে একাধিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এই অঞ্চলের মানুষ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাই দুর্বল বেড়িবাঁধে এ ধরনের অবৈধ সংযোগ ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাইকিং করে বেড়িবাঁধের ওপর ও নিচে স্থাপিত সব অবৈধ নাইন্টি ও পাইপ নিজ দায়িত্বে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ অবৈধ সংযোগ এখনো বহাল রয়েছে। ফলে প্রশাসনের ঘোষণার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
উপকূলের কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, প্রতিবছরই পাইপ অপসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায় না। বর্ষা ও জোয়ারের সময় দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লবণ পানি ঢুকে পড়ার শঙ্কায় তারা দিন কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী উপ-প্রকৌশলী মশিউর রহমান বলেন, “গত কয়েক মাস আগে কয়রা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাঁধের নিচে স্থাপিত অবৈধ পাইপ ও নাইন্টি অপসারণে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বর্তমানে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বর্ষা শেষে পুনরায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
এদিকে স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল দ্রুত অবৈধ নাইন্টি অপসারণ, বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষিজমিতে লবণ পানি প্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিষয়টি দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকলে কৃষি উৎপাদন, জননিরাপত্তা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ—সবই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।