
গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধিঃ
বরিশালের গৌরনদী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি কার্যক্রম, আবাসিক কক্ষ ব্যবহার, বাড়িভাড়া ভাতা গ্রহণ, খাবার সরবরাহ, প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা এবং দায়িত্ব বণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রটির অধ্যক্ষ আবুল বাশার আল মামুন ও অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক আল আমিনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, প্রশিক্ষণার্থী ও সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ না করেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ছাত্রাবাসের বিভিন্ন কক্ষ আবাসিক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অধ্যক্ষসহ কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী টিটিসির অভ্যন্তরে বসবাস করলেও তারা নিয়মিত বাড়িভাড়া ভাতা গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে সরকারি অর্থের অপচয় ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ আবুল বাশার আল মামুন টিটিসির ভেতরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রয়োজনের ভিত্তিতে তারা ভেতরে থাকছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, টিটিসিতে সরাসরি অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রমের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রশিক্ষণার্থীদের কেন্দ্রের সামনে একটি কম্পিউটার দোকানে পাঠানো হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রশিক্ষণার্থীদের ওই দোকানের মাধ্যমে ভর্তি ও অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করা হয়। এর বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৭ আগস্ট আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট থেকে সাইদুল ইসলাম নামে এক বিদেশগামী ব্যক্তি টিটিসিতে প্রশিক্ষণে ভর্তি হতে আসেন। তিনি কেন্দ্রের তৃতীয় তলা থেকে সরাসরি ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি জানতে পেরে অধ্যক্ষ আবুল বাশার আল মামুন কেন্দ্রের কর্মরত আব্দুল কাদেরকে ভবিষ্যতে এভাবে কেন্দ্রের ভেতর থেকে ভর্তি কার্যক্রম না করার জন্য সতর্ক করেন ।
ভর্তি খরচ সম্পর্কে জানতে টিটিসির সামনে থাকা কম্পিউটার দোকানের পরিচালক মো. আমিন খানের কাছে গেলে তিনি বলেন, ট্রেনিংয়ে ছেলেদের ভর্তি করতে প্রায় ৬৫০ টাকা খরচ হয়। আর নারীদের ভর্তি করতে প্রায় দুই হাজার টাকার মতো খরচ পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের নিজস্ব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন প্রশিক্ষণার্থীদের বাইরে নির্দিষ্ট একটি কম্পিউটার দোকানে পাঠানো হচ্ছে এবং অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে সেই অর্থের হিসাব কী।
নারীদের প্রশিক্ষণ নিয়েও দুই রকমের বক্তব্য পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক আল আমিন বলেন,কেন্দ্রে নারীদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তবে অধ্যক্ষ আবুল বাশার আল মামুন বলেন, হাউসকিপিং ছাড়া কেন্দ্রের অন্যান্য চালু প্রশিক্ষণগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
টিটিসির অভ্যন্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রান্না করা খাবার থেকেও বাইরে খাবার সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জামিলা বেগম ওরফে ‘করলা’ নামের এক নারী টিটিসির ভেতর থেকে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার নিয়ে কেন্দ্রের সামনে মো. সুজন ফকিরের দোকানে পৌঁছে দেন।
দোকান মালিক মো. সুজন ফকির জানান, এ খাবার তার জন্য নয় আমিন খান টিটিসিতে মেস হিসেবে মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ দিয়ে তিন বেলা খাবার খান। আমিন খান অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক আল আমিনের আপন ভাই। তিনি আগে টিটিসিতে কর্মরত ছিলেন। আয় কম হওয়ায় চাকরি ছেড়ে বর্তমানে কম্পিউটারের দোকান দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
জামিলা বেগম ওরফে করলা বলেন, আগে তিনি খাবার সরবরাহ করতেন। বর্তমানে আল আমিনের ভাই অসুস্থ থাকায় তিনি আবার খাবার সরবরাহ করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষ আবুল বাশার আল মামুন বলেন, আল আমিনের ভাইয়ের দোকানে কেন্দ্রের ভেতর থেকে খাবার দিতে তিনি আগেই নিষেধ করেছেন। এরপরও দেওয়া হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।
সরেজমিনে টিটিসির ভেতরে হাঁস-মুরগি ও কবুতর পালন করতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ আবুল বাশার আল মামুন বলেন, কেন্দ্রের ভেতরে হাঁস-মুরগি ও কবুতর পালনের বিষয়টি তেমন কোনো সমস্যা নয়। এতে সরকারের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। টিটিসির পঞ্চম ব্যাচের লিমন ফকিরসহ কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থী জানায়, প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস পার হলেও তারা এখনো বরাদ্দকৃত ভাতার টাকা পাননি।
লিমন আরও জানায়,ভাতার টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে প্রশিক্ষকদের সঙ্গে একাধিকবার কথা কাটাকাটি হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে নির্ধারিত ভাতা না পাওয়ায় তারা হতাশ বলেও জানান।
স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী মো. জসিম মোল্লা অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক আল আমিনের কথায় তিনি তার শ্যালককে টিটিসিতে কাজে দেন। প্রায় তিন মাস কাজ করার পর তার বেতনের অর্ধেক টাকা দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা আল আমিন আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে স্থানীয়দের চাপের মুখে বাকি টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন আল আমিন।
এদিকে টিটিসিতে কর্মরত না থাকা জামিলা বেগম ওরফে করলার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কক্ষের চাবি থাকা এবং তাকে কেন্দ্রের একটি কক্ষে রাতযাপনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয় জামিলা বেগম বলেন, কেয়ারটেকার দেলোয়ার সকালে দেরিতে ওঠেন। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চাবি তার কাছে রাখা হয়েছে। আর অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়েই তিনি সেখানে রাতযাপন করছেন।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ আবুল বাশার আল মামুন বলেন, তার চাকরি নেই। তিনি যে প্রকল্পে কাজ করতেন, সেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে এখানে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
টিটিসিতে নাইটগার্ড ও কেয়ারটেকার থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার চাবি কার কাছে থাকে, তা নিয়েও ভিন্ন রকম তথ্য পাওয়া গেছে।
কেয়ারটেকার দেলোয়ার জানান, চাবি অতিরিক্ত হিসাব রক্ষক আল আমিনের কাছে থাকে। অন্যদিকে আল আমিনের সঙ্গে কেয়ারটেকারের ফোনে কথোপকথনের সময় চাবি জামিলা (করলা) খালার কাছে থাকার কথা শোনা যায়।
জামিলা বেগমের পারিবারিক অবস্থান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। তার সৎ ছেলে রুহুল আমিন জানান,জামিলা(করলা) তার অসুস্থ বাবার সঙ্গে থাকেন না। একই সঙ্গে তিনি টিটিসির ভেতরে আল আমিনের সঙ্গে জামিলার পরকিয়া সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ আবুল বাশার আল মামুন। তিনি বলেন, জামিলা বেগমের সঙ্গে তার কোনো অনৈতিক সম্পর্ক নেই। তিনি ৫০ বছরের বেশি বয়সী একজন নারী। তাকে মোটরসাইকেলে নিয়ে ঘোরাফেরা করা তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন না।