
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার দুই যুবককে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে রাখা, বেতন বঞ্চিত করা এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগে গত ৮ জুন ২০২৬ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ঘটনাটিতে নতুন মোড় এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, সংবাদ প্রকাশের পর তাদের জব্দ করে রাখা পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তারা ওই জিম্মিদশা থেকে অন্যত্র চলে যেতে সক্ষম হন। পরে পরিবারের পাঠানো বিমান ভাড়ার টাকায় দেশে ফিরেছেন ভুক্তভোগী সৌরভ মোল্লা। তবে আরিফ হোসেন এখনো কম্বোডিয়ায় অবস্থান করছেন। তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে থেকে টুকটাক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন বলে জানিয়েছেন। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এর আগে প্রকাশিত সংবাদে অভিযোগ করা হয়, আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন বেপারী ও তার ছেলে ছিয়াম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, কম্বোডিয়ায় নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন বঞ্চনা এবং বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
দেশে ফিরে সৌরভ মোল্লা বলেন, “আমাকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে যখন কথাবার্তা হয়, তখন কামাল হোসেন কম্বোডিয়ায় অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকেই তিনি আমাকে নেওয়ার সব ব্যবস্থা করেন। আর বাংলাদেশে তার স্ত্রী সোহেলী বেগম ও ছেলে ছিয়াম হোসেন আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধাপে টাকা বুঝে নেন। এসব লেনদেনের স্থানীয় সাক্ষীও রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সংবাদ প্রকাশের পর আমাদের পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। এরপর আমরা সেখান থেকে অন্যত্র চলে যাই। কিন্তু আমাদের কোনো বৈধ চাকরির ব্যবস্থা করা হয়নি। দীর্ঘদিন কর্মহীন অবস্থায় থাকতে হয়েছে। একপর্যায়ে আমার বাবা বাংলাদেশ থেকে বিমান ভাড়ার টাকা পাঠানোর পর আমি দেশে ফিরতে সক্ষম হই। কম্বোডিয়ায় অবস্থানকালে আমাদের ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। প্রতিশ্রুত চাকরির পরিবর্তে বিভিন্ন অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হতো। আমি কোনোভাবে দেশে ফিরলেও আরিফ এখনো সেখানে রয়েছে। তার জীবননাশের আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের কাছে আমার দাবি, যারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, আমাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক এবং আরিফকে দ্রুত নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।”
কম্বোডিয়া থেকে মুঠোফোনে আরিফ হোসেন বলেন, “সংবাদ প্রকাশের পর আমার পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হলেও আমি এখনো কম্বোডিয়ায় আটকে আছি। বর্তমানে আত্মগোপনে থেকে টুকটাক কিছু কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছি। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সবসময় গ্রেপ্তারের আতঙ্কে থাকতে হয়। নিজের নিরাপত্তা নিয়েও প্রতিনিয়ত শঙ্কায় রয়েছি। আমি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। কিছু দিন পূর্বে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বনিক এর নিকট আমার মা গিয়েছিলেন, তখন তাকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে দেওয়া হয়েছে। আমি চাই প্রশাসন দ্রুত তদন্ত শেষ করে আমাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুক এবং এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।”
সৌরভের বাবা মো. জাহাঙ্গীর মোল্লা বলেন, “ধার-দেনা করে, এমনকি জমিজমা বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার ছেলে দেশে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের আর্থিক ক্ষতি কে পূরণ করবে? আমরা প্রশাসনের কাছে বিচার চাই। প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিপূরণ এবং এখনো কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত আরিফকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।”
আগৈলঝাড়া বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সৌরভের চাচাতো ভাই মো. আতিক মোল্লা বলেন, “বিদেশে চাকরির নামে এ ধরনের প্রতারণা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু দুটি পরিবারের ক্ষতির বিষয় নয়, বরং দেশের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রশাসনের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।”
এ ঘটনায় আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, আগৈলঝাড়া থানা, বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, “ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশনা এসেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর ব্যবহৃত সরকারি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত থাকার কথা জানান। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মো. কামাল হোসেন বলেন, দুই যুবককে কম্বোডিয়ায় পাঠানোর জন্য তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা নিয়েছেন। ট্যুরিস্ট ভিসায় কম্বোডিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদেরকে কনস্ট্রাকশন খাতে কাজের উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছিল। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জিম্মি করে রাখা, পাসপোর্ট জব্দ রাখা এবং বেতন পরিশোধ না করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “এসব অভিযোগ মিথ্যা।” টাকা-পয়সার লেনদেন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, মো. মাহাবুব ডাক্তার নামের এক জন সাংবাদিক ওই লেনদেনের সাক্ষী ছিলেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সংবাদ প্রকাশের পর পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগের মূল বিষয়গুলো এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। একজন দেশে ফিরলেও অপরজন এখনো কম্বোডিয়ায় অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত আরিফ হোসেনকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।